স্টেশনের নাম শরীর
শুভংকর গুহ
ল্যাম্পপোস্টের বৈদ্যুতিক
তারে সারি সারি ভোরের কাক ধোঁয়াশার সাথে ডানা মেলে ব্যালান্স নিচ্ছিল। কাঁচাকয়লার
ধোঁয়া নগরনিগমের আচ্ছাদনকে দূষণের পোশাক পড়িয়েছে যেন। আদিম জন্তুর মতো যানবাহনের
মন্থর গতি শহরের রাস্তাকে এখনও ব্যস্ততায় কাত করতে পারেনি। গাছের ডালে কেটে যাওয়া
ঘুড়ি সভ্যতার অভিশাপ নিয়ে সুতোয় ঝুলে আছে। বহুদূরে নদীর ওপরে ঔপনিবেশিক প্রাচীন
সেতু শহরের এপার ওপারকে যুক্ত করেছে। সবেমাত্র ঘুম থেকে ভেঙে ওঠা শহর এখন নিমদাঁতন
বা টুথপেস্টের স্বাদ ও গন্ধ নিতে-নিতে জরুরি কাজ করতে নেমে পড়েছে। জানালার ওপারে
সে শহর দেখছিল, ভোরের মৃদু বাতাসে কাটা ঘুড়ির লাট দেখতে-দেখতে টুথপেস্টের ফেনা
ভর্তি মুখে মনে-মনে বলে উঠল, আহারে বেচারা ঘুড়ি। সংবাদপত্র শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার
আগেই সে তার হাতের কাজগুলি দ্রুত সেরে ফেলতে চেষ্টা করছে। আর বারে বারে ঘড়ির
কাঁটার দিকে তাকাচ্ছে। ট্রেনের টাইম তার মাথায় গেঁথে আছে যেন। সে একবার জানালার
দিকে তাকিয়ে বুঝে নিতে চেষ্টা করল, মেঘাচ্ছন্ন দিনে ট্রেন ধরে বহুদূরে যাওয়া মানে
অনেকটা ফরাসি উপন্যাসের মতো গভীর বিষণ্ণ। শহরে আজ গভীর মেঘ করেছে। কালো ধূসর দূষণ
আচ্ছন্ন ময়লা রঙের মেঘ, স্থির, ঝলমলে আলো ট্রেনজার্নির আনন্দকে বিমর্ষ করে দেবে। সকাল
বা সারাদিনের রোদ বহুদূরগামী যাত্রাকে কমলালেবুর রঙের মতো খাসা সুন্দর করে তোলে। সে
বুঝতে পারল, মেঘাচ্ছন্ন দিনেই আজ তার যাত্রা ট্রেনের জানালার ওপারে গভীরতম মনখারাপ
উপহার দেবে। হলুদ রোদের সাথে ট্রেনের সফর যেন অন্যতম সৌভাগ্য।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের
শরীরের নিসর্গটিকে আরেকবার দেখে নিল, চুলে যথাযথ ব্রাশিং করে, শরীরে সুগন্ধি
স্প্রে করে, গালের চামড়ায় কিছুটা ভাবনার শিশির ফেলে দিল। আয়নার ফ্রেমে একটি মাছিকে
ফুঃ দিয়ে উড়িয়ে ট্রলি লাগেজের হ্যান্ডেল ধরে, ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে, জলের বোতল
ব্যাগের সাইড পকেটে রেখে, ডান হাতে চাবির গোছা নিয়ে টেবিলের ওপরে ফুলদানিতে রাখা
সাদা শুকিয়ে যাওয়া গোলাপের দিকে তাকিয়ে নিজেই আপন মনে বলল,— চললাম বলতে নেই, আসছি।
বাকিটুকু নিজের বিবরণে অপ্রকাশিত রেখে, ঘরের দরজার তালা পুনরায় দেখে নিয়ে গলিপথ
পার হয়ে মেইন রাস্তায় হাত দেখাল। একটি ট্যাক্সিতে উঠে বসে বলল,— স্টেশন। একটু
চালিয়ে যাবেন। পাঁচ মিনিট লেটে চলছি।
ট্যাক্সি ড্রাইভার বলল, ভোরবেলার
রাস্তা ফাঁকাই আছে। দশ মিনিটে পৌঁছে যাব।
ব্রিজের ওপরে ট্রাম থমকে আছে বলে,
গতি ব্যাহত হল। নদীর ওপরে ধোঁয়াশা কেমন থমকে
আছে। ভোরবেলার নগরের ধোঁয়া শহরকে কেমন আচ্ছন্ন করে রেখেছে। লঞ্চ ঘুম ভেঙ্গে
এপার ওপার করছে। স্ট্রীট লাইটের ভেপার নিয়নের আলো এখনও জ্বলছে। ট্যাক্সি আশেপাশে
কাত নিয়ে স্টেশন পর্যন্ত বাকিটুকু মসৃণ। ট্যাক্সির ভাড়া দিতে-দিতে,—ভাড়া কত হল?
ভোরবেলা, দশটাকা বেশি দেবেন।
কি মনে হয় আজ বৃষ্টি হতে পারে?
যে-ভাবে মেঘ করেছে, হতে পারে।
আপনি কি করে জানলেন?
কালকে রাতে টিভির খবরে বলছিল।
ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার আগেই সে পোঁছে
গেল, ফোন ক্লিক করে দেখে নিল, ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার এখনও পাঁচ মিনিট বাকি আছে। পা
চালিয়ে সে নিজের সংরক্ষিত সিটে বসে একটি খবরের কাগজ নিয়ে সে প্রথমেই দেখে নিল,
বৃষ্টির সংবাদ। বৃষ্টি হতে পারে, অকালে এমন হলে, মন্দ নয়। কিন্তু তার জানালার পাশে বসে মনে হল, রোদ থাকলে ট্রেনের
জার্নি বেশ উপভোগ করা যেত। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিল, রেললাইনের ধারে
প্রবল বস্তি ও মানুষের কোনওরকমে টিকে থাকার প্রবল ইচ্ছাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, ভয়ানক
দূষণযুক্ত জলাশয়, কাপড়কাচা স্নান কুলকুচো থালাবাসন ধোয়া মলমূত্র ত্যাগ পায়খানা
ব্যবহারের জল সবকিছুই এক দিঘির জলনরকে। কেমন বমি আসছিল তার। তখনই একজন চকচকে
রূপালি রঙের কেটলি হাতে, সর্দি কাশি স্পেশাল লবঙ্গ ও আদা চা বলে হকারি করছে। সে নিতে যাবে, জানালার ওপাশে নরকদিঘির চিত্র তার মনের
ইচ্ছাকে প্রতিহত করল। এই শহর নাকি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বস্তি।
নেবেন?
না। বমি আসছে।
এই চা খেলে আর বমি আসবে না। লবঙ্গ
আদার সাথে বিটলবণ আছে।
শরীর গুলোচ্ছে। এখন নয়। পরে এসো।
পরের স্টেশনে নেমে যাব।
ঠিক আছে। বললাম তো এখন নয়। বমি
পাচ্ছে।
তার শরীরের ভিতরে কেমন যেন শব্দ
হল। কান পাতল নিজের শরীরের ভিতরে। ট্রেনের দ্রুত চলে যাওয়ার গতি, চাকার শব্দ,
আশেপাশে যাত্রীদের কথোপকথন, হকার ফেরিওয়ালাদের ফেরি করার শব্দ তাকে অমনোযোগী করে
তুললেও সে নিজের শরীরের গভীরে কান পেতে জানতে চেষ্টা করল, নিজের শরীরের শব্দ।
শরীরেরও গোপন একপ্রকার যন্ত্রণা ও আনন্দের শব্দ থাকে। নিজের শরীরের গভীরে ডুব দিয়ে
সে জানতে চেষ্টা করেছে সেই গোপন শব্দের ভাষা। নিজের শরীরের গভীর শব্দ একবারে জানা
যায় না। সে বারে বারে নিজের শরীরের ভিতরে কান পাতল।
জানালার ওপাশ দিয়ে সরে যাচ্ছে
একের-পর-এক শহরতলী স্টেশন, তার কিছুক্ষণ পরে বিচিত্র নামের সব গ্রামীণ স্টেশন। সেই
যে ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পরে, নরক দিঘি পুকুর ও জলাশয়ের দুর্গন্ধময় ছবিকে ধুয়ে দিল গ্রামীণ জলাশয় ও খালবিল।
টলটলে জল, হাঁস ভেসে আছে সুখী জীবনের মতো,
জলে জলে ফুল ফুটে আছে। জলের পাশ ধরে চলে যাচ্ছে সাইকেলচারী ও পথচারী। ওদের ছায়া
পড়েছে জলে। দেখে মনে হয় চলমান জীবনে কোনো অভাব বা কষ্টের দাগ নেই। ট্রেন যত এগিয়ে যেতে থাকল, আকাশকে সে অনেকটাই পরিষ্কার
আবিষ্কার করল, রোদ নেমে এল ট্রেনের জানালার ওপরে, চমৎকার সবুজ ধানমাঠ তার মনের
গহীনে আরাম দিল। কোথায় সকালের সেই মনখারাপের মেঘ। ঝকঝকে রোদের হলুদ চাদর, গভীর
উজ্জ্বলতায় মগ্ন। সে বুঝতে পারল, মেঘ থাকলেও, মেঘের ফাঁক দিয়েই রোদের প্রকাশ
ঘটেছে। এইবার সে নিজেই নিজের শরীরের গভীরে ডুব দিল, বুঝতে পারল তার শরীর থেকে আরও
একটি শরীর বদলে যাচ্ছে। একটি শরীরের পতন হলে আরও একটি শরীরের জন্ম হয়। শরীরের
রূপান্তরের শব্দ।
নিজের দুটি হাতকে আলতো করে, নিজের
শরীরের ওপরেই সে ভূমিদাগ দিল যেন। আহা শরীর!!! শরীরের ভিতরে একটা শব্দ হচ্ছে না?
শরীরের ভিতরে সৈকত থাকে, বিকেলের বালুকাবেলা, সারি সারি গাছ, বাতাসের সোঁ সোঁ
শব্দ, সড়কের ওপর দিয়ে যান চলে যাওয়ার শব্দ, অরণ্যের মধ্য দিয়ে বুনোমোষ চলে যাওয়ার
শব্দ, পকেটের ভিতরে খুচরো পয়সার ঠোকাঠুকির শব্দ, বাগানের মালির খুরপি দিয়ে মাটি
বোনার শব্দ, মাঝির বৈঠা দিয়ে জল কেটে নেওয়ার শব্দ, শরীরের গভীরে ঝিঁঝি পোকার
একটানা শব্দ। মাঝেমধ্যেই শরীরের গভীরে সে এমন শব্দ শুনতে পায়। আর যখনই সে শুনতে
পায় তখনই তার অনুশাসনহীন এমন সব ভাবনা তাকে আক্রান্ত করে।
আবার এবং বারে বারে সে ফোনের সুইচ
ক্লিক করে সময় দেখতে-দেখতে ভেবে নিল প্রায় তিন ঘণ্টার ওপরে ট্রেন চলার পরে, ট্রেন কতক্ষণ
দাঁড়িয়ে আছে বুঝতে পারলেও, কারণ জানতে পারছে না। এতক্ষণ ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকার কথা
নয়। কেন দাঁড়িয়ে আছে, বুঝতে পারছে না। কোনো দুর্ঘটনা? আশেপাশের সহযাত্রীরা নানারকম
কথা বলে যাচ্ছে। সম্ভবত কোনো নাশকতা? না তাও নয়। নির্দিষ্ট করে কিছুই বলা যাচ্ছে
না। একজায়গায় ট্রেন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে যে অস্বস্তি যাত্রীদের হয়, ঠিক তাই।
পরস্পর যাত্রীরা নিজেরাই অনেক কথা বলছে। সে কান পেতে শুনছে।
কিন্তু তার সাথে কেউ কথা বলছে না,
সেও কারোর সঙ্গে কথা বলছে না। সেই যে ট্রেন ছেড়ে এসেছে তার সঙ্গে কোনো সহযাত্রীই যেচে
আলাপ করেনি। কথাপ্রসঙ্গে কোনো কথাই কেউ তার সঙ্গে বলেনি। অথচ যাত্রীরা পরস্পর সবার
অপরিচিত হলেও নিজেরাই সমস্ত দ্বিধা অতিক্রম করে, কথাবার্তার জমাটি আসর পেতে
নিয়েছে। নানারকম কথা— চাকরি, রাজনীতি, সামাজিক ব্যভিচার, অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য,
শেয়ার বাজার, আয়কর, রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রিত হলুদ সাংবাদিকতা ও বোকা বোকা মিডিয়া,
ব্যাংকের সুদ নানা প্রসঙ্গ। সে কান পেতে কিছু কথা শুনছে, যে-কথাগুলি একেবারে বোকা
বোকা সেই কথাগুলিকে কানে নিচ্ছে না। আসলে সে এমন এক সহযাত্রী যার দিকে কৌতূহল নিয়ে
সবাই তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার সাথে কথা বলার সাহস কেউ করছে না। আসলে কথা হয়তো কেউ
বলতে চাইছে, কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব তার সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুমোদন দিচ্ছে না।
সে উইন্ডো প্যাসেজ সিটে বসে আছে,
স্লিপার সিট ব্যবধানে। সংরক্ষিত বগিতে যে ব্যবধান স্বাভাবিক। সবাই তাকে তলচোখে দেখছে।
নিজেই বুঝতে পারছে, অনেকেরই দৃষ্টির শিকার। নিজের অস্বস্তি উপভোগ করতে-করতে
জানালার বাইরে ট্রেন থেমে থাকার দৃশ্য উপভোগ করছে। কখনো কখনো খবরের কাগজ পড়তে-পড়তে
ঢুলুনি দিচ্ছে। আর ট্রেন থেমে থাকার মহাবিরক্তির জন্য মাঝে মাঝে শ্বাস ছাড়ছে।
বুঝতে পারছে, গন্তব্যে পোঁছে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা বলে আর কিছু থাকছে না।
নিজের সাজিয়ে রাখা সমস্ত পরিকল্পনাই তার চৌপাট হয়ে গেছে। জানালার বাইরে চোখ রেখে
বুঝতে পারছে, আকাশ কেমন অস্বাভাবিক ঝুঁকে পড়েছে। একেবারে কাত হয়ে গেছে। ওখানে গেলে
যেন, হাত বাড়ালেই আকাশকে ছোঁয়া যাবে। মনে হচ্ছে, ওখান থেকেই সাগরের সূচনা বা সব
জমিই সাগরে মিশে গেছে।
তার উল্টোদিকের সিটে একজন প্রবীণ
যাত্রী, গালে সাদা ধবধবে রবীন্দ্রদাড়ি, সাদা ফতুয়া। ডোরাকাটা পায়জামা— সাদাকালো
স্ট্রাইপ। তার স্ত্রী ঠিক তার পাশের সিটে। চোখ বুজে ঢুলুনি দিচ্ছে। বৃদ্ধ মাঝে মাঝে চেষ্টা করছে তাকে কিছু
বলার জন্য। কিছু বলতে গিয়েও কথা ফিরিয়ে নিচ্ছে বারে বারে। অনেকক্ষণ ধরেই বলতে
চাওয়া কথা ঝড়ে ভেঙে যাওয়া পাখির বাসার মতো ঝুলিয়ে রেখেছে বৃদ্ধ ঠোঁটের ডগায়।
কিন্তু কোনো কথা বলতে চাইলেও না-বলার জন্য একপ্রকার অস্বস্তি থাকেই। সেই ট্রেন ছেড়ে
আসার অনেকক্ষণ পর থেকেই লক্ষ করছিল প্যাসেজ বা করিডোরের পাশে ডানদিকের সিটে বসে
আছে সুঠাম দুজন যুবক। ওদের মধ্যে একজন বেশ হ্যান্ডসাম। ব্যাকব্রাশ করা পরিপাটি
চুল, সামনের দিকে ফেদারটাচ ব্রাউন। দুইজনের পোশাকেই কর্পোরেট এফেক্ট। যে-ভাবে কথা
বলছে, তারা এসেছিল বিশেষ কাজে, ফিরে যাচ্ছে নিজেদের শহরে, গন্তব্যে। দুজন যুবকই
তাকে দেখছে, এবং মনে মনে কিছু ভার্সন সাজিয়ে নিচ্ছে। ওদের পাশেই সিটের ওপরে রাখা
আছে, দুটি ফুলের তোড়া। ভারী চমৎকার দেখতে। দেশি ও বিদেশি ফুলের সমাহারে সাজানো
গুচ্ছ। গঠন চমৎকার এ্যান্টিক উচ্ছ্বসিত বিমর্ষ, সেলোফেন পেপারে মোড়ানো, ফুলের তোড়া
এমনই আসর বা অনুষ্ঠানের শেষে প্রাপকের একপাশে রেখে দেওয়ার পরে বড়ই একা দুঃখী হয়ে
যায়। ফুলগুলি পাতাগুলি ক্রমশ শুকিয়ে ওঠায় ন্যাতানো। ফুল তখন ফুলে নেই— না রঙে বা
গন্ধে। ফুল এমনই শুকিয়ে যাওয়াই তার নিয়তি।
সে মনে মনে অনুমান করছিল, যুবক দুটি
শহরে এসেছিল সম্ভবত কোনো অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠানেই ওদের সম্মানিত করা হয়, ফুলের
তোড়া দিয়ে। অনুষ্ঠান শেষে ফিরে যাচ্ছে ভোরবেলায় নিজেদের গন্তব্যে। নিজের কথার
সঙ্গে ভ্রমণ করতে-করতে সকাল থেকে বেলা গড়ানোর সাথে, থেমে থাকা ট্রেনের সঙ্গে সব
যাত্রীর মতনই কান পেতে আছে ট্রেনের হুইসেলের জন্য। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার এখনও কোনো
সংবাদ নেই। হলুদ মাঠের পাশে টুকরো টুকরো জলের টুপছাপ, আকাশের প্রতিচ্ছবি ছেঁড়া ছেঁড়া
জলের আয়নায়। সোনালি রোদের ঝকঝকে বেলা। মেঘাচ্ছন্ন ভোরবেলার প্রস্থান তাকে আনন্দিত
করে তুললেও ট্রেন যে থেমে আছে। আবার নিজের হাতের মুঠোয় ফোন ক্লিক করে দেখে নিল,
ট্রেন থেমে থাকার সময়ের ব্যবধান। ঠিক কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে ট্রেন? দূরে বহুদূরে
অস্পষ্ট জলরঙের মতো ছড়িয়ে আছে, সারি সারি অস্পষ্ট পাহাড়। হলুদ মাঠের পাশে চোখের পলক
ফেলার মতো একটি সেতু। সেতুর নীচে খাল জলাশয়ের অশ্রুদাগ। এইসব বিবরণ উপভোগ করতে-করতে
তার ঝিমুনি আসছিল।
হঠাৎ তার সামনে উলটোদিকে বসে থাকা
বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলল। এই প্রথম তার দিকে তাকিয়ে, নিশ্চিত তাকেই কিছু
বলার জন্য কেউ সাহস পেল যেন। সে বৃদ্ধের দিকে তাকাল। কিন্তু কিছু বলল না। কিন্তু
তার দৃষ্টি কিছু বলল যেন মৌন থেকেই। বৃদ্ধ তাকে বলল আবার, —বয়স হলে শরীর শরীরে
থাকে না।
বৃদ্ধের কথা শুনে সে চমকে উঠল।
কিছু বলতে গিয়েও নিজেকে ফিরিয়ে নিল। বৃদ্ধের কথাটি পুনরায় শোনার জন্য বৃদ্ধের দিকে
এমনভাবে তাকাল, আপনি কিছু বললেন? আমি শুনিনি। আবার বলতে পারেন।
বৃদ্ধ একইভাবে আবার বলল,— বয়স হলে
শরীর আর শরীরে থাকে না।
আপনি কি কথাটি আমাকে বললেন?
আপনাকে? না তো, এমনিই বললাম।
বললেন যে? আমার দিকে তাকিয়েই বা
বললেন কেন?
আপনি আমার সামনে বসে আছেন, তাই
আপনার মনে হচ্ছে আপনাকেই বললাম।
আমি ভাবলাম আপনি আমাকেই বলছেন।
আপনার শরীর যখন আমার মতো হবে, তখন
শরীর সম্পর্কে আপনার ভাবনা আমার মতনই হবে। বৃদ্ধ মানুষের শরীর শরীরে থাকে না। তখন
শরীর ফেলে আসা যৌবনের আশ্রয় চায়।
আপনার এই বয়সে যদি শরীর যৌবনের আশ্রয় চায় তাহলে
সেই আশ্রয়ের মধ্যে নির্ভরতা বোঝায়। নির্ভরতা কি সমর্পণের ভাবনা?
তা কেন? শরীর এক বড় ভাবনা। একটি
জনপদের, একটি গ্রামের মতো। হ্যাঁ, যে-কোনো শরীরের সম্মান আছে— তা বৃদ্ধ বা যৌবনেরই
হোক না কেন!
সম্মানিত শরীর শরীরের মধ্যেই
থাকে। সেই শরীর নির্ভরতা চায় না।
আমি নির্ভতার কথা বলিনি। আমি
বলেছি বয়স হলে শরীর আর শরীরে থাকে না। বললাম তো, আপনি আপনার অবস্থান থেকে আমার কথা
বুঝতে পারবেন না। আমি কথাটি কিন্তু আপনাকে বলিনি। আপনি কেন ভাবছেন কথাটি আমি
আপনাকে বলেছি?
আপনি আমার সিটের উলটোদিকে বসে
আছেন, আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এবারে বলুন আমি কি ভাবতে পারি?
আপনার ভাবনা আপনার কাছে সত্যি।
সবার ভাবনাই নিজের কাছে সত্যি হয়। যেমন আমি এখন ভাবছি, আমি নিজের এই বৃদ্ধ ও
দুর্গন্ধময় শরীরটিকে ক্রমশ খুলে ফেলছি। নিজের শরীরের বিভিন্ন রোগ, মিথ্যা দিয়ে গড়ে
তোলা ব্যভিচারী এক শরীর খুলে যাচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে ট্রেনের কম্পার্টমেন্টের ভিতরে।
একটি শরীর ওপর থেকে দেখতে যত সুন্দর ভিতরে ততটাই শিউরে ওঠার মতো। আমি আমার নিজের
শরীরটিকে খুলে ফেলছি, শরীরের সমস্ত দরজা ভেঙে ফেলছি। রক্তাক্ত মাংসল কেটে কেটে
আলাদা করে ফেলছি, শরীরের ভিতরে দুর্গন্ধময় মলমূত্র ও গলার মাংসের ওপরে ক্যান্সার
এই সবকিছুই আপনাকে ভ্রমণের পথে উপহার দিতে পারি। দেখুন, ভালো করে দেখুন,
সহযাত্রীরা কেমন আমার ছিন্নবিচ্ছিন্ন শরীর দেখে, বৃদ্ধ পচা মাংস দেখে কেমন শিউরে
উঠছে। আমি তাই বলেছি বিনাশের পথে এই বৃদ্ধ শরীর শরীরের ভিতরে থাকে না। আপনি নিজেই
দেখুন কেমন নাকে রুমাল চাপা দিচ্ছেন। দুর্গন্ধ পাচ্ছেন?
প্রায় জানালার বাইরে মুখ নিয়ে,
ওয়াক থুঃ... ওয়াক থুঃ... বমি আসছিল তার। থুতু ফেলে দিয়ে অসহায়ের মতো অন্যদিকে
তাকিয়ে বৃদ্ধের কাছ থেকে মনোযোগ সরিয়ে বহুদূরে জমির ওপরে নির্জন নিসর্গের সন্ধান
করতে থাকল। ঘৃণা, শোক ও বেদনার আশ্রয় একমাত্র নিসর্গই দিতে পারে।
সত্যি করে বলুন তো আপনি কি
দেখছেন?
একটি লাশকাটা ঘর দেখতে পাচ্ছি।
পচা মাংস খুবলে ওঠা মানুষের দেহ পড়ে আছে স্যাঁতস্যাঁতে লাশকাটা ঘরের মেঝের ওপরে,
দেওয়ালের কাছে অন্ধকারে কয়েকটি দানবীয় আকারের মাংসাশী ইঁদুর আর লাশকাটা ঘরের ডোম
মদ্যপান করে বুঁদ হয়ে গোঙাচ্ছে।
আর কিছু?
বললাম তো যা দেখছি।
আমাকে। আমার ছিন্নবিছিন্ন
লাশটিকে?
যে পচা লাশগুলি পড়ে আছে কোনোটাই
চেনা যাচ্ছে না।
ভাগ্যিস আমাকে চিনতে পারেননি, না-হলে
এই ট্রেনের যাত্রা বেমালুম...
বেমালুম কী? কী বলুন?
দুইজন যুবক তাকে দেখছিল, তার
আচরণের সাথে নিজেদের আচরণ মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করছিল। বসে থাকা মানুষের আচরণের
মধ্যে দৃষ্টি বা তাকিয়ে থাকার আচরণ খুঁজে নিতে হয়। হাঁটাচলা করলে, মানুষের শরীরের
আচরণ ও অভিব্যক্তি বোঝা যায়। একজন যুবক তাকে কিছু বলতে যাচ্ছিল। অন্যজন তার হাত চেপে
দিয়ে তাকিয়ে নীরবে এমন বলল,— কী বলতে চাও তুমি? কী প্রশ্ন তাকে করতে চাও? বোকার
মতো কিছু বোলো না যেন! দেখলে না বৃদ্ধ ভদ্রলোক তার দিকে তাকিয়ে বললেও কিন্তু তাকে
কথাটি বলেননি, কিন্তু তাকে কতটা হেনস্তা হতে হল। কত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হল।
আসলে আমার ভয় হচ্ছে, তুমি যদি বৃদ্ধ ভদ্রলোকের মতো শরীর নিয়ে কিছু কথা বলে ফেলো,
উপস্থিত সবাই ভাববে, কারও-না-কারোর শরীর নিয়ে তুমি প্রহসন করছ।
যুবক দুটির মনে অবস্থানের কথা
ভেবে বৃদ্ধ, প্রবীণ মানুষটি নিজেই আবার নিজের কাছে বলল,— অথচ শরীর এক অনন্ত।
অন্তহীন তার আকার। সময়ের ঘাত-প্রতিঘাতে ক্ষতবিক্ষত।
একজন যুবক তার বন্ধুর কানে ফিসফিস
করে বলল,— আমি নিশ্চিত হতে চাইছি। আমার কৌতূহল চেপে বসেছে।
খবরদার না। এই বোকামি করলে তোমাকে
অপমানিত হতে হবে। তখন অপমানের জ্বালায় আমাদের পরের স্টেশনে নেমে যেতে হবে। তা হবে
এক বড় বিড়ম্বনা।
তা হলে আমি ট্রেনের জানালার বাইরে
বিবরণ দেখি।
দেখো। কিন্তু দেখে তোমার কোনো
প্রতিক্রিয়া দেওয়া চলবে না। নিজের মধ্যেই সব কথা নিজের মধ্যেই রেখে দাও। প্রকাশ
করা চলবে না। কারণ তুমি এখন যা কিছু বলবে, তা শরীর সম্পর্কিতই হয়ে উঠবে।
তা কেন?
কারণ আমরা এখন যা কিছু ভাবছি তা
শরীর সম্পর্কিতই।
সে তাকাল, কিন্তু যুবক দুজনের
দিকে নয়। ওরা খেয়াল করেনি ফুলের তোড়াটি ওদের পায়ের নীচে কখন পড়ে গেছে। সে নিস্পলক
তাকিয়ে ছিল ফুলের তোড়াটির দিকে। দুটি ফুলের তোড়ার মধ্যে একটি পড়ে গেছে, অন্যটি
সিটের একধারে ঝুলছে। দুটি ফুলের তোড়া, ফুলের গুচ্ছ বা তোড়া হলেও আকার ও রঙে দু-রকম।
যুবক দুটি ফুলের তোড়ার দিকে নজর না-রেখে, তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। সে নীচে পড়ে
থাকা যুবক দুজনের ফুলের তোড়াটির দিকে বিরক্তির সাথে তাকিয়ে ছিল। যেন দৃষ্টিতে বলতে
চাইল, সব আকার, গঠন ও শরীরের সম্মান আছে। আসলে কেউ শরীরের প্রতি সম্মান না-জানিয়ে
শরীরের প্রতি কৌতূহলপুরন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
ট্রেন সেই সকাল থেকেই দাঁড়িয়েছিল।
কিছুক্ষণ হল চলতে শুরু করেছে। কেউ সঠিক কোনো সংবাদ দিতে পারল না ট্রেন কেন
দাঁড়িয়েছিল। সবাই ভাবছিল, নিশ্চয়ই কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছিল। আজকাল তো নাশকতামূলক ঘটনা
ঘটে চলেছেই। নাশকতার ক্রোধের কারণ রাষ্ট্র কোনোদিন জানতে চেষ্টা করে না। সেই কারণ যদি রাষ্ট্র জানতে
চেষ্টা করত, তা হলে নাশকতামূলক ঘটনা আর ঘটতই না। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পরে সবারই সময় গুলিয়ে
গেল, কোন স্টেশন কখন আসবে? এখন নির্দিষ্ট স্টেশনে পোঁছে যাওয়ার তেমন আর সময় নেই।
ট্রেন চলছিল, প্রথমে মন্থর ঘন ঘন হুইসেলের সাথে, তারপরে ট্রেনের গতি এখন
স্বাভাবিক, যে-ভাবে দূরপাল্লার ট্রেন গতি নেয়। চারদিকে বিস্তৃত হলুদ ফসলের মাঠ, এই
সময়ে ফসল তুলেফেলার পরে ফসলহীন মাঠের যে শূন্যতার হলুদ। মাঝে মাঝে গ্রামীণ মাটির
রাস্তা সুতো রেখার মতো দ্রুত সরে যাচ্ছে। আর হাইরোড চিরে দিচ্ছে রেললাইনের ধারে
ঘুমিয়ে থাকা গ্রামচিহ্নকে। ট্রেনের ইঞ্জিনের মাঠকাঁপানো
শব্দ।
যতই ট্রেন এগিয়ে যাচ্ছে, সে বুঝতে
পারছে, ট্রেনের সহযাত্রীরা তাকে উৎসাহিত হয়ে দেখার কৌতূহলে হারিয়ে ফেলেছে। প্রতিটি
মানুষ তার অস্তিত্বের ও শরীরের ঠিকানা নিয়ে বসে আছে।
দুপুর প্রায় গড়িয়ে গেল। এই সময়
বুনো কাঠকুটোর ধোঁয়া ও গন্ধে ট্রেনের বগি ভরে উঠল। দুপুর পড়ে গেলেই প্রান্তে
কাঠকুটো পোড়ানোর আয়োজন চলে। পাশে পাশে জনপদ, বা নিঝুম কয়েকটি শহর মাটির বাড়ি ও
উনুনের ধোঁয়া এইসব কিছুর মধ্যে অদ্ভুত এক ভিন্নতা আছে। সে দেখল ফাঁকা ধুধু মাঠের
পরে ঘন ঘন পাকা বাড়ি, টেলিকমের টাওয়ার, ব্যস্ত মহাসড়ক, দোকান, মোটরসাইকেল,
আর বিক্ষিপ্ত কয়েকটি মন্দির-মসজিদ-কবরখানা। মাঝে মাঝে নগরের ধুলোয় ধূসরিত শহুরে গুল্মলতার ঝোপ, কাঁটাতারের বেড়া আর ঘনঘন
উদ্ভিদের মতো মানুষের সমাহার। সে উঠে দাঁড়িয়ে তার লাগেজ হাতে টেনে নিল। জলের বোতল,
ক্যামেরা কলম, ব্যাগের ভিতরে রাখা পারফিউম বার করে, নিজের শরীরে পোশাকে স্প্রে করে
নিল। আবার নিজের হাতব্যাগ সিটের ওপরে রেখে দিয়ে বাকি টুকিটাকি যথাযথ গুছিয়ে নিল।
বোতলের ছিপি খুলে নিয়ে কয়েক ঢোক জল গলায় নামিয়ে দিয়ে বোতলের ছিপি আটকানোর সময় সে
লক্ষ করল, সবাই তাকে হাঁ করে গিলছে যেন। সহযাত্রীরা বুঝতে পারছে তার নেমে পড়ার
স্টেশন এসে গেল।
এবার সে নেমে যাবে। সে সেই তার
সিটের উলটোদিকে বসে থাকা প্রবীণ মানুষটিকে দেখল লাশকাটা ঘরের ভিতরে পড়ে থাকা
রক্তজল ঘেঁটে চলেছে। এতক্ষণ তাদের বেশ কাটছিল একটি শরীরের কৌতূহল ও রহস্য নিয়ে। সে
নিজের সমস্ত মালপত্তর নিয়ে ট্রেনের ঝাঁকুনির সাথে মন্থর এগিয়ে যেতে থাকল করিডোর
অতিক্রম করে দরজার দিকে। ট্রেনের গতি খুব মন্থর হয়ে গেছে। স্টেশন আসার আগে খটাখট
রেললাইনের ক্রসিংয়ের যেমন শব্দ হয়, তেমনি দুলে ওঠা বগির সাথে নিজের গন্তব্যে নেমে
পড়ার একটা আনন্দ তো থাকেই।
কী যেন নাম? কী যেন নাম? নিজের মনেই সে হাঃ হাঃ হাঃ হেসে উঠল... স্টেশন
এসে পড়তেই নিজেই বলে উঠল, — শরীর... শরীর... শরীর...
শরীরও যে একটি স্টেশন।
যার ভূমিকা আছে কিন্তু প্রস্তাবনা
নেই।
জানার কোনো দরকার নেই। সবারই যেমন
গন্তব্য নিজের শরীরের মধ্যেই তেমনি ট্রেনযাত্রীর গন্তব্য একটি স্টেশন। কি দরকার
স্টেশনের নাম জানার? স্টেশনের নাম আগেই ঠিক হয়ে আছে।
শরীর... শরীর... শরীর...
দুইজন যুবক জানালার ওপরে হুমড়ি
খেয়ে পড়ে দেখছিল। সে নেমে পড়ল। একজন এগিয়ে এসে তার লাগেজ নামিয়ে নিতে সাহায্য করল।
কী অসম্ভব ফাঁকা স্টেশন! কোনো লোকজন নেই। নিজেরাই তারা কিছু কথার টোকা দিল। দুজনেই
খুশির হাসি হাসল। নিবিড় আলিঙ্গনে পরস্পরকে গভীর চুম্বন করল। ট্রেন ছেড়ে দিল। নিঃসঙ্গ
ও অরণ্য প্রায় আঁধার-আচ্ছন্ন ভূমিতে ট্রেনের হুইসেল কেঁপে উঠল।
আকাশে তখন গভীর কালো মেঘ।
বৃষ্টি হতে পারে।
| শিল্পী: চন্দন মিশ্র |
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন