বুধবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২২

ছোটগল্প: বৃষ্টিমেয়ে: শুভঙ্কর বিশ্বাস

 


বৃষ্টিমেয়ে

শুভঙ্কর বিশ্বাস 

রে দুজন মাত্র প্রাণী। বাকি তিনটি ঘর ফাঁকাই পড়ে থাকে। অতিথিরা আসলে তখন একটু জমজমাট। তাও সে ছ’মাসে-ন’মাসে। মাঝারি ধারার বৃষ্টি এখন মুষলধারায় ঝরছে। সুন্দর কংক্রিটের ঘরে এই মুখরতা আন্দাজ করা মুশকিল। তবে গত কয়েকদিনের দাবদাহ থেকে মুক্তি, এই যা আনন্দ।

আজ আর অফিস যায়নি পুষ্পেন। সারাদিন গড়িয়ে কাটাবে। সকালের মেঘ যখন আকাশে বলিরেখা টানতে শুরু করে তখনই মনে মনে ভেবে রেখেছিল এমন। বেলা একটু বাড়তেই বৃষ্টি শুরু। ব্যস, নিজেই নিজের ছুটি ঘোষণা করে দিল সে। আরাম করে আজ একটু বিশ্রাম নেওয়া যাবে। বৃষ্টি সম্পর্কে আলাদা করে তার কোনও রোমান্টিকতা নেই, আছে পাশে শুয়ে থাকা সুজাতার।

বৃষ্টি খুব পছন্দ করে সুজাতা। কেন তা বুঝে উঠতে পারে না পুষ্পেন। প্যাঁচপ্যাঁচে বৃষ্টি ভালো লাগার মতো কিছু নেই। সারাদিন একঘেয়ে হতে থাকে। কোথাও বেড়বার জো নেই। অবশ্য তেমন বাইরে কোথাও বের হয় না সে। অফিস যাওয়ার সময় বিপত্তি আসলে তখন রেগে যায় খুব। তবে আজ রক্ষে, বহুদিন ছুটি নেওয়া হয় না। অফিসে জরুরি তেমন কোনও কাজও ছিল না আজ। সুযোগের সৎ ব্যবহারটা করা গেল। সারাদিন রেস্ট। তবে একবার একটু বেরোতেই হয়েছিল। এই ভরা বৃষ্টির দিনে মাংসভাত হলে জমে যায়। সুজাতা রান্না করবে বটে, কিন্তু মাংস আনতে যাবে কে? অগত্যা পুষ্পেনকেই বেরোতে হল গায়ে রেইনকোট চাপিয়ে। অদূরেই বাজার। ফিরেই অমনি ঘরে। ব্যস, আজ আর বেরোনোর কথা ভাববেই না। বিছানায় শুয়ে রান্না মাংসের সুন্দর ঘ্রাণ নিতে-নিতে টিভির পরদায় চোখ রেখেছিল সে। পাশেই রান্নাঘর। সুজাতা রাঁধে বেশ। আজ জমে যাবে বটে! বারোটা নাগাদ একটু ঘুম এসেছিল, হঠাৎ তাকে ডেকে তুলল সুজাতা। কী হল ডাকছ কেন? ঘুমচোখে প্রশ্ন করেছিল পুষ্পেন।

দুপুর দুটোরও বেশি বাজে, স্নান-খাওয়াদাওয়া করতে হবে তো? সুজাতার গলা বেশ মিষ্টি শোনাচ্ছে। ঘুমচোখে তাকিয়ে থাকে স্ত্রীর দিকে। সুজাতা সুন্দরী। তবে গুণ বলতে রান্নার হাত ভালো। খুবই ভালো। এইটুকু গুণেই চলে যায় পুস্পেনের। সে ঝঞ্ঝাট-বিরুদ্ধ মানুষ। বউয়ের বেশি গুণ থাকলে ঝামেলাও বেশি। যা আছে তাই অনেক। মনে মনে ভাবতে থাকে পুষ্পেন। রান্না হয়ে গেছে?

হ্যাঁ, হয়ে গেছে, স্নানও। সুজাতা হাসে। যাও, দেরি হয়ে যাচ্ছে।

হয়ে গেল এর মধ্যে? কী করে এত তাড়াতাড়ি সব করো বলো তো?

তুমি যাবে স্নানে না কি...! মুখে হাসি। গলায় শাসনের ভঙ্গিতে উত্তর দেয় সুজাতা।

       বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে পুষ্পেন।

সে যেতেই বিছানাচাদর সোজা করে সুজাতা। রান্নাঘর থেকে খাবার এনে টেবিলে রাথে। সঙ্গে দুটো থালা । দুটো থালাই ব্যবহৃত হয় সাধারণত। আর-একটা বাড়ানো গেলে ভালোই হত। হয়নি। চাপা দীর্ঘশ্বাস আছড়ে পড়ে নির্জন ঘরের কোণে।

থালাগুলির জল মুছে টেবিলের নির্দিষ্ট জায়গায় রাখে।

সমস্যাটা পুষ্পেনেরই ছিল। অনেক ডাক্তার, অনেক দৌড় হয়েছে প্রথম প্রথম। তারপর থেমে গেছে। এই নিয়ে সুজাতা তাকে কোনোদিন অপমান করেনি। ছোট করেনি। মন খারাপ হয়েছে পুষ্পেনের। সুজাতা তাকে আগলে রেখেছে স্নেহ-ভালোবাসায়।

কিছুদিন থম মেরেছিল সব। আবার চলতে শুরু করেছে। সব নয়— তবে স্নেহ-ভালোবাসা, দেখভাল, যত্ন। সে আট-দশ বছর আগের কথা। তবে সব কিছু ঠিক হয়নি আজও। মাঝে মাঝে কান্না পায় সুজাতার। কান্না লুকিয়ে রাখে । সব মানুষের কান্না আছে। কান্না সামলে তাই সে সংসার সামলায়।

দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে আছে পুষ্পেন। রিমোট হাতে বারবার চ্যানেল পালটায়। একবার খবর, একবার খেলা। কী হলো, বারবার চ্যানেল পালটাচ্ছ কেন? নরম গলায় প্রশ্ন করে সুজাতা।

ভালো লাগছে না।

শরীর খারাপ লাগছে?

না না। একটু ঘুমোনোর দরকার ছিল। ঘুম আসছে না। চেষ্টা করো, দেখো ঠিক আসবে।

তখনই বৃষ্টিটা আরও গতি নিয়ে নামে। জানালার কাচ দিয়ে টের পায় সুজাতা৷ একটু সরে গিয়ে কাচটা সরায়। বৃষ্টির ছাঁট গায়ে এসে লাগে। আর-একটু এগিয়ে যায়, মুখ বাড়িয়ে দেয় জানালায়। ধীরে ধীরে একটা অন্ধকার নেমে আসে সুজাতার চোখে। তাঁর সামনের দৃশ্য বদলে ছোটবেলায় ফেরে। ন’বছরের অনাথ মেয়ে এক দৌড়ে চলে যায় মাঠের দিকে। সেখানে গভীর মেঘের পতন। পাগল করা বৃষ্টির ছন্দে নাচতে থাকে সে। আবার এক দৌড়। দৌড়োতে-দৌড়োতে মেয়েটি কাদামাটির সাথে মিশে চারাগাছ হয়ে যায়। বৃষ্টির আদরে গাছ বড় হতে থাকে। হঠাৎ একদিন কারা যেন তার হাত ধরে নিয়ে আসে এই ঘরে। সুন্দর সাজানো কংক্রিটের ঘর। জানলার পাশে বসে ভিজতে থাকে সুজাতা। পাশে শুয়ে আছে পুষ্পেন।

বৃষ্টি, প্রবল বৃষ্টি। গাছের পাতাগুলো ভিজে যাচ্ছে। তারা আরও আরও প্রাণবন্ত। দূরের বিশাল গাছটা হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। তীব্র মাদকতা। পুরোনো কান্নাটা চেপে ধরে তাকে। বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগে মুখে, গলায়, শরীরে।

একটা হাত এসে সুজাতার হাত ধরে, বিদ্যুৎ খেলে যায় এক লহমায়! বাইরে নয় ভেতরে। পুষ্পেনের দিকে তাকায় সে, কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, কিছু বলবে?

কী করছো, ভিজে যাচ্ছ যে!

ইচ্ছা হচ্ছে।

 

না, সরে এসো! কাছে টেনে নেয় পুষ্পেন। জানো, তোমার ঠান্ডার ধাত। আবার রোগে পড়বে।

কিচ্ছু হবে না। বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে উত্তর দেয় সুজাতা। আজ কী হয়েছে বলো তো যে, এই বয়সে বাচ্চাদের মতো করছ?

জানালা বন্ধ করে সুজাতা, কান্না ভুলে যায়। মুখে হাসি। উত্তর দেয়, আমার বয়স? তা নিজের বয়সের কথা মনে আছে?

কত আর হবে, খুব বেশি হলে আটত্রিশ। তোমারও ত্রিশ পূর্ণ হয়েছে মনে রেখো। পুষ্পেনও মৃদু হাসে।

ভিজেগায়েই পুষ্পেনের বুকে মাথা রাখে সুজাতা। ঘুমাবে বললে যে?

বলেছিলাম, কিন্তু ঘুম আসছে না।

আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, তুমি একটু ঘুমোও।

না থাক, তা তুমি ঘুমাবে না? তোমার কাপড় তো ভিজে গেছে দেখছি!

বেশি ভেজেনি, এক্ষুনি শুকিয়ে যাবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে দুজন।

আর কথা হয় না। নীরবতা ক্রমশ গিলে খেতে থাকে ওদের। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে দুজন।

কলিং-বেলটা বাজতেই ঘুম ভেঙে যায় সুজাতার। দ্বিতীয়বার বেজে ওঠে। সামনে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে পাঁচটা বেজে গেছে। পুষ্পেন ঘুমিয়ে। ডাকা ঠিক হবে না। সে নিজেই ওঠে। একটা চাদর জড়িয়ে নেয় গায়ে। দরজা পেরিয়ে বাইরে আসতেই সুজাতা দেখতে পায় বাইরে দুজন কলাপসিবল গেট ঘেঁষে। বৃষ্টি কিছু কমেছে। ঝিরিঝিরি হচ্ছে। একটু এগিয়ে যেতেই একজনকে চিনতে পারল সে। সায়ন্তন! পুষ্পেনের অনুজ বন্ধু। আরে তুমি? এসো এসো!

 

হ্যাঁ, বহুদিন দাদার সাথে দেখা হয় না। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। তা ভাবলাম একবার দেখা করে যাই। পুষ্পেনদা আছেন?

আছেন। গেট খুলে দিল সুজাতা। এসো!

ভেতরে এল দুজনেই। অসময়ে এলাম। ঘুমাচ্ছিলেন নিশ্চয়ই?

না, তেমন কিছু করছিলামও না। তোমরা বসো। আমি ওঁকে ডেকে দিই। পাশের ঘর দেখিয়ে দেয় সুজাতা।

কিছুক্ষন পর পুষ্পেন এল। মুখে দারুন হাসি, কী রে, এতদিন পর এলি, তাও এই বৃষ্টির দিনে?

হ্যাঁ, চলেই এলাম। এই বৃষ্টিদিনে প্রকৃতির এমন মাধুর্য কে হারাতে চায় বলো? তাই এই পরম মুহূর্তে বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। তা বউদি, আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই, ও আকাশ, আমার বন্ধু। দাদার সাথে ওঁর আলাপ আছে।

ও আচ্ছা। নমস্কার, দাদা।

নমস্কার।

ও একটু স্বল্পভাষী। আর আমি একটু বেশি কথা বলি । সুজাতা হাসে।

তুই বকাটে আমরা জানি। পুষ্পেন বলেই হেসে ওঠে। তা এই ঝড়জলের দিনে কোথায় বেড়িয়েছিস?

বাইরে ঝরজল। ভালবাম বেরিয়ে পড়া যাক। গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম আকাশদের বাড়ি। ওঁকে নিয়ে, সোজা রাস্তা ধরে, পথেই তোমার বাড়ি পড়ে গেল।

পুষ্পেন জানে সায়ন্তন একটু পাগলাটে ধরণের। মেধাবী ছেলে। ভালো চাকরিও করে। তবে একটু বাউন্ডুলে স্বভাবের। ঘুরে বেড়ানো ওঁর নেশা। সবাইকে সহজেই আপন করে নেয়।

এই তোমরা বোসো, তোমাদের জন্য চা বানাই।

চা? এই বৃষ্টিদিনে চা হলে তো জমে যাবে। সায়ন্তন বলে। সোফা ছেড়ে উঠে পড়ে সুজাতা।

পুষ্পেন বলে, তা কেমন আছিস বল!

      ভালোই আছি দাদা। ঘুরে বেড়াচ্ছি। আনন্দ পাচ্ছি। আর কী!

তোমার এই বন্ধুর কিন্তু মাথা খারাপ। আকাশের দিকে তাকিয়ে পুষ্পেন বলে। আকাশ হাসে। কোনও উত্তর দেয় না।

আজ অফিস যাসনি?

এরকম দিনে অফিস যেতে নেই, দাদা! আমি জানতাম তুমিও যাবে না। সায়ন্তন উদাস কণ্ঠে কথা বলে যাচ্ছে।

তুই অভিনয়টা পেশা করতে পারতিস বুঝলি?

পারতাম দাদা। কিন্তু এক জায়গায় মন টেকে না।

আড্ডা জমে উঠেছে। কিছুক্ষণ পর সুজাতা ঘরে আসে, হাতে দুটো বড় প্লেট। একটিতে চারটে চায়ের কাপ। অন্যটিতে বেগুনি। সায়ন্তন আবার শুরু করে, এই বৃষ্টিদিনে চায়ের সাথে বেগুনি, আহ্‌! আর আপনার হাতের রান্না, বউদি! তার যে তুলনাই হতে পারে না।

সুজাতার হাসি যেন থামেই না। আরে তুমি আর নাটক কোরো না তো, খাও!

নাটক না, নাটক না। একটা খেয়ে দেখ, আকাশ। এই বলে নিজে একটা বেগুনি তুলে কামড় বসায়। বলে, অসাধারণ! সুজাতা কিছু বলে না। মুচকি হাসে কেবল।

তা তোরা ঠিক যাবি কোথায়? পুষ্পেন বলে।

যাওয়ার কি ঠিক আছে, দাদা? রাস্তা রাস্তাই, যেদিকে দু-চোখ যায়, চলে যাব। তবে একটা ব্যাপার। আজ আমি ভূতের ঘোরে আছি। হয়তো রাস্তায় পেয়েও যেতে পারি।

কী বলছিস তুই?

কিছুদিন একটা সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমার চারপাশে ভূতেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেখানেই যাচ্ছি কিছু একটা ঘটে যাচ্ছে।

খুব জোরে হেসে ওঠে পুষ্পেন। সুজাতাও।

হাসি পাচ্ছে?

না না। সরি। তুমি বলো। হাসতে-হাসতে বলে সুজাতা।

আর কী বলবো, ঘুমোলে ভূত, জাগলেও ভূত!

সত্যি? উত্তর দেয় সুজাতা।

হ্যাঁ, সত্যি! এই তিনদিন আগে রাতে ঘুমোচ্ছি, ঘুমটা হঠাৎ-ই ভেঙে গেল। বুকের উপর কী একটা ভার অনুভব করলাম। মনে হল আমাকে কেউ চেপে ধরে আছে। কী বুঝতে না-পেরে হাত দিয়ে ভারটা নামাতে যাব, দেখলাম নিজের হাতটাই নাড়াতে পারছি না। উঠে বসব, পারছি না। পা-ও নড়ানোর ক্ষমতা নেই। কাউকে ডাকব? মুখে একটা শব্দ পর্যন্ত করতে পারলাম না! আমি জেগে আছি, অথচ কে যেন আমার সারা শরীর তার বীভৎস ক্ষমতার জোরে জাপটে রেখে দিয়েছে! তাকে আমি দেখতে পারছি না। অনুভব করতে পারছি না কোনোরকম ভাবে। শুধু বুঝতে পারছি আমার শরীর আমার ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

চোখ বড় বড় করে সুজাতা, সত্যি?

হুম! তারপর খানিক পরই সব ঠিক হয়ে গেল। কিছুই যেন হয়নি। বিছানা ছেড়ে উঠে জল খেলাম অনেকটা। সব ঠিক। তবে কি মনের ভুল? বুঝতে পারছিলাম না কিছুই! শুধু একটা ভয় কাজ করছিল ভেতরে-ভেতরে।

কী বলছো কী! অবাক চোখে সায়ন্তনের দিকে তাকিয়ে থাকে সুজাতা।

গতকাল বাড়ির আয়নাটা আপনা-আপনিই ভেঙে পড়ে গেল, ঘরে কিন্তু কেউ ছিল না!

পুষ্পেন কিছু বলছে না, হাসছে শুধু। সুজাতা চোখ বড় বড় করে শুনছে সব।

তুমি হাসছ, পুষ্পেনদা? আকাশকে বললাম ঘুমের ঘোরে কে আমাকে চেপে ধরেছিল, বলল— স্লিপিং প্যারালাইসিস! আমি বলি হঠাৎ যদি মাঝরাতে এমন হয় তাহলে এসব মনে থাকে? তাই ঠিক করেছি ভূত খুঁজবো!

ভূত খুঁজবে?

হ্যাঁ। ভূত আমাকে ঠিকঠাক খুঁজে বের করার আগে ভূতকেই আমি খুঁজে বের করব। আর ভূত থাকলে ভগবানও থাকবে। ব্যস, এই পথে তাকেও পেয়ে যাব।

তুই কী বলছিস কোনও মাথামুণ্ড নেই, পুষ্পেন বলে।

আমি তোমাকে বলছি দাদা, ভূতকে মনে হচ্ছে আমি পাবই। যখন কলেজের ছাত্র ছিলাম, তখন কিছুদিন আমার এক দূঃসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে হয়েছিল। অজপাড়াগাঁয় পুরোনো তিনতলা বাড়ি। তিনতলা ঠিক নয়, দোতলা বাড়ির ছাদের উপর একটা চিলেকোঠার ঘর। সেই চিলেকোঠার ঘরে থাকতাম। একা। সেখানে প্রথম দিন থেকেই বিপত্তি। গ্রামের লোকজন খুব তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আমিও সবার সঙ্গে আটটার মধ্যে খেয়ে আমার ঘরে চলে আসতাম। কিন্তু তাড়াতাড়ি ঘুমের অভ্যাস আমার নেই। সেই সময়টা বই পড়তে শুরু করলাম। পড়ার কিছু বই সঙ্গে ছিল। এগারোটা পর্যন্ত পড়ার পর ঘুমোতে-ঘুমোতে সাড়ে এগারোটা-বারোটা। কিন্তু প্রথম দিনই মাঝরাতে ঘুমটা ভেঙে যায়। চারিদিকে গ্রামীণ নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতার মাঝখানে আমি একা শুয়ে আছি। হঠাৎ একটা মিষ্টি নূপুরের শব্দ কানে এল। ছম্‌ ছম্‌ ছম্‌! কান পেতে শব্দটা শুনছিলাম। শব্দটা যেন অনেক দূর থেকে ক্রমশ কাছে আসছে। উঠে বসলাম বিছানায়। হ্যারিকেনের সলতের আগুন তখনও নিভে যায়নি। কাছে নিয়ে এসে আগুন বাড়িয়ে দিলাম। মৃদু নূপুরের শব্দ আমার ঘরের সামনে, যেন কোনও এক সম্ভবনা আমাকে ডাকছে। কাছে গেলে নতুন কিছু পাব। সেই রাতে আমি আদৌ ঘুমিয়েছিলাম কি না আমার আজও মনে নেই। কীভাবে রাত কেটে যায় জানি না। সকাল একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেল। কাউকে কিছু বলিনি। বললে আমার আত্মীয়রা সেখানে থাকতে দিত না। ওই চিলেকোঠার ঘরটা আমার খুবই পছন্দ হয়েছিল। পরদিন রাত হতেই ভয় বাড়তে থাকল। সঙ্গে একটা কৌতূহল। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! সেদিনও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। আবার সেই একই নূপুরের শব্দ। ছম্‌ ছম্‌ ছম্‌! চুপ করে শুনলাম কিছুক্ষণ। শব্দটা এগিয়ে আসছে। কী মনে হল, আলো জ্বাললাম না। একছুটে দরজা খুলে সোজা বাইরে ছাদে এসে দাঁড়ালাম। কোথাও কিচ্ছু নেই। বিশাল একটা একাকিত্বের মাঝে হঠাৎ আমি একা এসে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু সেই নূপুরের ছম্‌ ছম্ ছম্! শব্দ দূরে, আরও দূরে ভেসে চলে যাচ্ছে। এবার সব চুপ। চরম নীরবতা। দূরে গাছেদের আঁকিবুকি। আরও দূর, আরও বিশাল এই জগৎ। আকাশের লক্ষকোটি তারার এমন উজ্জ্বলতা আগে কোনোদিন চোখে পড়েনি। কোথাও আলোকদূষণ নেই সেখানে। মেকি শব্দের হুঙ্কার নেই। একটা আসল পৃথিবী পড়ে আছে সব ঘুমন্ত মানুষের অজান্তে। এই পৃথিবী যেন এক শাশ্বত বিবেক, আর আমি তার সামনে যেন একটা প্রশ্ন নিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছি। বাকি সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সায়ন্তন চুপ করে। অন্যেরা কথা বলছে না। আকাশ পাশে চুপ করে বসে আছে। পুষ্পেন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সায়ন্তনের দিকে। সুজাতার দৃষ্টি অনেক দূরে, সে কোথাও হারিয়ে গেছে যেন!

তোর ভয় লাগল না? নীরবতা ভাঙে পুষ্পেন।

না।

কখন হত শব্দটা? প্রশ্ন করে সুজাতা।

এই ধরুন রাত দুটো নাগাদ।

সত্যিই কি তেমন কিছু আছে? আবার প্রশ্ন করে সুজাতা।

জানি না। আমি সন্ধানী। খুঁজে বেড়াচ্ছি। তবে আজ মনে হচ্ছে কিছু হবে। আজ আমরা ভূত পেয়েও যেতে পারি!

তোর মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। বিয়েটাও করলি না। বউ থাকলে তোকে ঠিক করে দিত। এখন দেখছি বিয়ে না-করার ফলে তোর ঘাড়ে সত্যি সত্যি ভূত চেপেছে। পুষ্পেন বলে।

না দাদা, ভূত খুঁজে বের করাটা খুব জরুরি। এ সমাজ ছাঁচে গড়া। সব মানুষ একই ব্যাকরণে প্রতিদিনের জীবন সাজাচ্ছে। এই একঘেয়ে স্বভাব মানুষকে দুঃখ দিচ্ছে। এর বাইরে একটা কিছু থাকা দরকার।

তোমার কথা ঠিক। তবে কেন জানি না আমার ভীষণ ভয় লাগছে। সুজাতা বলে।

ভয় পাবার কিছু নেই। ভূত এমনি ভালো। ওরা কারোর ক্ষতি করে না। হঠাৎ সামনে এসে পড়ে এই যা সমস্যা। মানুষ প্রত্যাশার বাইরে বেরোতে ভয় পায়। মৃত্যু অপ্রত্যাশিত। তাই মৃত্যু মানুষের সব চেয়ে বড় আতঙ্ক।

সায়ন্তন উঠে পরে। সঙ্গে আকাশও। ওঁদের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে যায় পুষ্পেন। চারচাকা গাড়িটা কাছেই রাখা ছিল। গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যায় তারা।

কাপপ্লেট তুলে নিয়ে সুজাতা রান্নাঘরে চলে যায়। ঘরের অনেক কাজ বাকি। বাড়ির কাজ সে এক হাতেই করে। কাজের জন্য কাউকে রাখতে চেয়েছিল পুষ্পেন। সে রাজি হয়নি। তুমি অফিসে চলে গেলে আমাকে বাড়িতে একাই থাকতে হয়, সারাদিন কী করব? বাড়ির কাজ করলে সময় কেটে যাবে। নিজের হাতে সব করাও হবে, বলেছিল সুজাতা। ঘরের কাজ সেরে চা বানিয়ে নিয়ে এল দুজনের জন্য। পুষ্পেন আধশোয়া। টিভি দেখছে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সুজাতা।

সন্ধে হয়েছে। উঠে বসো। সুজাতার কথায় বিছানায় বাবু হয়ে বসে পুষ্পেন।

সারাদিন তো গড়িয়ে কাটালে।

কী আর করব বলো, কাল থেকে তো আবার অফিস।

হুম, আর এদিকে আমাকে একাই থাকতে হয় বাড়িতে। পুষ্পেন চুপ করে যায়।

চা ভালো হয়েছে?

ভালো হয়েছে। একুটু বলে ফের চুপ পুষ্পেন। সুজাতা বুঝতে পারে একা থাকার প্রসঙ্গ পুষ্পেনের কানে লেগেছে। তবে সে তেমন ভাবে বলতে চায়নি। যা হবার নয়, তা নিয়ে সে এখন আর ভাবে না। তবু মাঝে মাঝে...

তুমি ভূত বিশ্বাস করো? সুজাতা অন্য প্রসঙ্গ আনতে চায়।

না, করি না।

আমি করি।

ও! পুষ্পেন আর কিছু বলে না, কেবল টিভির চ্যানেল বদলায়।

তবে সে হঠাৎ সামনে এলে কী করতাম জানি না। ভয়েই মরে যেতাম হয়তো।

হঠাৎ ভূত দেখার শখ হল যে?

আজ সায়ন্তন সারা বিকেল যা ভূত ভূত করল, সত্যি বলতে মাথায় তারপর থেকে ওটাই ঘুরছে। অদ্ভুত ছেলে কিন্তু সায়ান্তন। বলো?

তা যেতে পারতে ভূত খুঁজতে! হঠাৎ পুষ্পেন ঝাঁঝিয়ে ওঠে।

ধুস! ওঁরা সব পাগল। সুজাতা আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে প্রসঙ্গ ঘোরাতে চায়।

আমি তো ইন্টারেস্টিং না! আমার সঙ্গে থাকছ কেন?

সুজাতার মুখ অন্ধকার করে এল। কী বলছ কি তুমি?

কিছুই না, আমি তো ওসব কথা মনে রাখিনি। তুমি বেশ মনে রেখেছ, তাই!

এই ভালো মানুষটার ভেতরে যে পোকাটা ঘুমিয়ে থাকে, আজ তা কি জেগে উঠল হঠাৎ? এই রূপ এই চরিত্রকে ভয় পায় সুজাতা। ওর অপারকতা এই হীনম্মন্যতার জন্ম দিয়েছে। তাই সন্দেহ করতে থাকে তাকে। এসব জানে সুজাতা। কোনোদিন তার জন্য আঙুল তোলেনি সে। কঠিন বাস্তবকে মেনে নিয়েছে নিজেকে অনেক বুঝিয়ে। এই ভালোবাসার ঘরে কোনও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়নি। কান্না পায় তার। সে-কান্না পুষ্পেনকেই জড়িয়ে। ওঁর অক্ষমতা সুজাতার মনে ঘৃণার জন্ম দেয়নি। তবুও শুনতে হল!

হঠাৎ আবার ঝড় নামে। প্রচণ্ড ঝড়। সন্ধের ঘনঘোর আরও কালো করে এল। মেঘডাকার প্রচণ্ড চমকে ঘোর কাটল পুষ্পেনের। সুজাতার দিকে তাকিয়ে বলে, একী, কাঁদছ?

চোখের জল লুকিয়ে হাসল মেয়েটি। বলে, না না। দেখো, বাইরে আবার বৃষ্টি নামল।

হ্যাঁ, তাই তো৷ কয়েকটা বেগুনি ভাজো তো। সঙ্গে মুড়ি।

সুজাতা এক দৌড়ে চলে গেল রান্নাঘরে।

মনের মধ্যে কোনও পোকা ঢুকে গেলে সহজে তা যায় না। ঘুমিয়ে থাকলেও তা জীবন্ত।

পুষ্পেন সেরে উঠেছে আপাতত। কিন্তু সুজাতা? মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। হঠাৎ যেন তার মনে একটা ভয় কাজ করছে। কীসের ভয় সে বুঝতে পারে না। শীত লাগছে খুব। ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত দুটো। চমকে ওঠে সুজাতা। ঘরের দরজা খোলা। হাওয়া আসছে সেখান থেকেই। কী করে খুলল! শোওয়ার আগে কি বন্ধ করা হয়নি? মনে পড়ছে না। ভেতরের ভয় ক্রমশ বাড়ছে। পুষ্পেনকে ডাকবে? বলবে ভয়ের কথা? না, সাহস পায় না সুজাতা। আবার যদি পোকাটা...। নিজেই ওঠে বিছানা ছেড়ে। নীচে পা রাখতেই একটা শব্দ, ছম্! দ্রুত এক পা এগিয়ে সরে গেল। আবার সেই একই শব্দ, ছম্! আরও তাড়াতাড়ি দরজার কাছে এগিয়ে গেল সে, এই ভয়কে সরিয়ে ফেলবে মন থেকে। তার সাথে শব্দটাও ছুটছে। ছম্ ছম্ ছম্! দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে তাঁর পায়ের নূপুরের কথা। আর এক পা এগোতেই বুঝতে পারে শব্দটা তার পায়ের নূপুর থেকে আসছে। ভয় কেটে যায়। কিছুই হয়নি। শুধু শুধু ভয়ে মরছিল। নিজেকে শান্ত করে। তখনই নিজেকে হালকা মনে হয়। ভার নেমে গেছে। কী মনে হয়, আবার দরজাটা খোলে। বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে? গ্রিলে-ঘেরা বারান্দার কাছে এসে দাঁড়ায়। বৃষ্টি হচ্ছে টের পায়। আর একটু এগিয়ে যায়। হাওয়ায় ঝাপটে বৃষ্টি গায়ে এসে লাগে। আবার ভিজে যেতে থাকে। আরও বেশি, আরও বেশি। পুরোপুরি ভিজে যায়। আর এক পা নাচায়। ধীরে। নিজের পায়ের নূপুরে নিজেই আওয়াজ করতে থাকে সুজাতা, ছম ছম ছম্!

অদ্ভুত লাগে। আবার সেই অনুভূতি ফিরে আসতে শুরু করছে সুজাতার ভিতর!

কান্না পাচ্ছে। তার চিরদিনের কান্না। কে যেন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ফিরে তাকায়। পুষ্পেন! জড়িয়ে ধরে সুজাতা। আঁকড়ে ধরে তাঁকে। ভাঙে। অঝোরে কাঁদে। তবু বলতে পারে না...

কাঁদতে থাকে সুজাতা। কেঁদে ওঠে নূপুরের আওয়াজ, ছম্‌ ছম্ ছম্‌!

শিল্পী: চন্দন মিশ্র 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কথাসাহিত্যিক নলিনী বেরার সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন অন্তরা চৌধুরী

  প্রত্যেকটা উপন্যাসই আত্মজৈবনিক :   নলিনী বেরা                    ( নলিনী বেরার সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন অন্তরা চৌধুরী) বাংলা কথাসাহিত্যে নলিনী...