রুপালি পাপ
আইরিন সুলতানা
বড় গাঙের ঢেউ তোলা মেঘনার কোনও এক পাড়ের মাঝারি
একটা গ্রাম। নাম বলা যাবে না গ্রামের। তাহলে হুইসেল বাজিয়ে কানের পরদা ফাটিয়ে ছুটে আসবে কানুন। এমনিতেই ওদের ফেউ
ঘোরে গ্রামে। হাবেভাবে ফেউরা নিজেদের ইলিশের মায়বাপ বুঝিয়ে দেয়। ঋতুর ফেরে বছরে একেকবার
ইলিশ বনধ্ দেয় সরকার। তারপর মায়বাপরা নদীতে ট্রলার নিয়ে
টহল দেয়। নদীপাড়ে গিয়ে বাঁশি দেয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে লাঠি ঠকঠক করে। জেলেদের দিকে চোখ
ঘুরিয়ে তাকায়। এই সময়টায় গ্রামের জেলেদের খবর
চাউড় হয় নদী থেকে নদীতে। কানাঘুষা চলে মাছ থেকে মাছের কানকোতেও। ওরা ইলিশ ধরেছে! ওরা
ইলিশের দুশমন! পাপী জেলেদের জেলে পুরে দেওয়া হয়। হাতজোড় করে নাকচোখের নোনা জল গাল থেকে
গলায় গড়িয়ে কেউ কেউ মাফ পায়।
ইলিশের গা থেকে দ্যুতি ঠিকরে বেরোচ্ছিল ভরদুপুরের
আগে-আগে। এত ইলিশ একটানে জালের বাগে আসেনি আগে।
শাংলা জালটা টানতে-টানতে
জামাল মিয়ার চোখ রুপালি হয়ে ওঠে। জাল থেকে ইলিশ ছাড়াচ্ছিল সেবু। তাই দেখতে-দেখতে জামাল মিয়া
ঠিক করে ফেলে, আজকেই তার জেলে জীবনের সম্মানজনক অবসর হোক।
এক বছর
আগের কথা এসব। এরমধ্যে জামাল মিয়া ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। শখ করে রুপার গয়না
গড়িয়ে দিয়েছে মেয়েকে। একটা কমদামি বেনারসি, সেটাও রুপালি রঙের। বিয়েতে তার মেয়েকে ইলিশের
রানি দেখাচ্ছিল। ইলিশ মাছের লেজের মতো শাড়ির আঁচল নাড়িয়ে
মেয়ে চলে গেল বড় গাঙের এক চরে। সেখানে স্বামী-সংসার নিয়ে সুখে থাকবে মেয়ে, ভাবতে-ভাবতে মাছ ধরা ছেড়ে দিয়ে নিজের একটা পেট চালানোর জন্য জালবোনা আর সারাইয়ের কাজ ধরল জামাল মিয়া।
ঘরের আশেপাশে শাকপাতা আর দু-চারটে সবজি লাগিয়ে
চোখ মুদে চৌকাটে বসে মেঘনা থেকে ভেসে আসা ইলিশের ঘ্রাণও
নেয় মাঝে মাঝে।
বয়সের শেষ পর্বটা দুঃসাহসী জেলে জীবনের পুঁথি শুনিয়েই কাটতে পারতে জামাল মিয়ার। কিন্তু
কুপির আলোয় সে পুঁথি আওড়াতে-আওড়াতে ঘরের দোরে
একচিলতে ছায়ার উদয় হল। রুপালি রঙের সুটকেস হাতে জলঙ্গী দাঁড়িয়ে।
জলঙ্গীর বিয়ের মেয়াদ ইলিশ মাছের জানের মতো হবে তা অবসর নেওয়া জেলে জামাল মিয়া ভাবেনি। শুরুতে সংসারে অনেক সোহাগ ছিল জলঙ্গীর। তারপর জামাইয়ের মন ঘরে
টেকে না আর। একদিন চরের বাজারের চালের আড়তের পেছনের চালায় এক মাগীর সাথে স্বামীকে খাটে
রঙ্গতামাশা চলার মধ্যে হাতেনাতে ধরল জলঙ্গী। বউবেটির পা এত লম্বা হওয়াটা অপরাধ। জলঙ্গীকে
চুলির মুঠি ধরে টানতে-টানতে ঘরে আনা হল। সাথে জুটল মুখে একদলা থুথু আর তিন তালাক। সারা বাজার দেখল তাকিয়ে-তাকিয়ে। মাইয়া মানুষ এত ছোঁকছোঁক করলে তার কী দশা হয় তা বুঝে
নিল বাকি বউবেটিরা। সারারাত দুই চোখের নোনাজল গড়িয়ে খুব ভোরে বড় গাঙ, চর, সংসার, চালের
আড়তের পেছনের গোপন চালাটা আরও পেছনে ফেলে রুপালি
সুটকেসটা নিয়ে রওনা দিল জলঙ্গী।
একপেটা জামাল মিয়ার সামনে এখন দুই পেটের দায়।
নিজের আর স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ের। পুঁথি বন্ধ করে চোখ খুলে অন্ধকার দেখল জামাল মিয়া। টুকটাক জাল বুনে আর সারাই করে দুই পেটের ভাত জুটবে না। তার
উপর যুবতী মেয়ে। আবার জামাইয়ের কাছে ফেরত পাঠানো লাগবে, নাকি ছয় মাস পরে আবার কারও ঘরে তুলে দিতে হবে— সে চিন্তার কারেন্টজালে ফেঁসে থাকে জামাল মিয়া। কিছু কাঁচা টাকা তো লাগবেই। তাহলে কি আবার মেঘনায়
জাল ফেলবে?
পান্তায় শুকনা মরিচ হাতে ভেঙে মাখাতে-মাখাতে
হুঁশিয়ার করল জলঙ্গী। এখন তো ইলিশ বনধ্ চলে। জেল-জরিমানা
হয়ে যাবে। পেট আর পিঠ দুটোই যাবে শেষে।
কানুন তো দিনে টহল দেয়। রাতে এখনও এদিকে দেয়
নাই। বিড়বিড় করে জামাল মিয়া। হাতে ধরা চান্দি জাল। ইলিশের ঝাঁক জাল গলে বেড়িয়েছিল,
সেটা সেলাই করতে দিয়ে গেছে সেবু। এখন বড় গাঙে তার বিরাট ওস্তাদি। আর বনধের সময় ফেউদের
খবর দিয়ে কাঁচা টাকা কোঁচড়ে পুরে নেয়। সেবুর নৌকাটা ঘাটে বান্ধা থাকে। রাতের মেঘনায়
ওটা ভাসিয়ে জাল ফেলে ইলিশ ধরে আরেক ঘাটের বাজারে বেচে দিতে পারলেই নগদ টাকা।
শীত আসতে আরও দুই-চার দফা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি বাকি থাকলেও মেঘনার পাড়ে বাঁধা নৌকায় মধ্যরাতে
মৃদু ধাক্কা দেয় ঢেউ আর হিম বাতাস। জালটা নৌকায় ছুঁড়ে দেয় জামাল মিয়া। তারপর গুলুইয়ে
ধাক্কা দিয়ে একলাফে উঠে পড়ে ভাসতে থাকা নৌকায়।
বৈঠা চালিয়ে এগোয় মেঘনার বুকে।
পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে জলঙ্গী। মুঠোতে চাপ বোতামের
দেশি মোবাইল ফোনটা ধরা। বিয়ের সময় তার বাপ জামাল মিয়া কিনে দিয়েছিল। জামাল মিয়ার কাছেও
একটা আছে। যদি পাড়ের দিকে কাউকে আসতে দেখে তাহলে সুযোগ বুঝে ফোন দিয়ে সতর্ক করবে জলঙ্গী।
পাড়ে সেবুর নৌকাটা আবার এনে বেঁধে না-রাখা পর্যন্ত চিন্তা
কাটছে না তার।
জলঙ্গী দাঁড়িয়ে আছে একটা হিজল গাছের নীচে। দুরু দুরু করা বুকে কয়েকবার ছ্যাপ দিতে-দিতে ভিজে গেছে ব্লাউজ। জামাল মিয়া ইলিশ ধরে আরেক ঘাটে গিয়ে
বেচে তারপর ফিরবে। কখন ফেরে কে জানে!
জলঙ্গীর মনে হল দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে সে অন্ধকারে মিলিয়েই যাবে। ওই সময় ছায়ার মতো নদীর দিকে কিছু একটা আসতে দেখল। ঘ্যাঁচ করে
পাড়ে ভিড়ল নৌকাটা। কাঁধে জাল ফেলে রাখা জামাল মিয়াকে দেখে আটকে থাকা দম ছাড়ল জলঙ্গী।
জামাল মিয়াকে ঘিরে ভুরভুর করছে ইলিশের গন্ধ।
জলঙ্গী বলল, চলো ফিরি তাড়াতাড়ি। পা চালাও।
জামাল মিয়া কোচা থেকে মুঠো ভরে কিছু বার করে
মোবাইলের টর্চটা জ্বালায়। বাপজানের হাত ভর্তি
কাগজের টাকা আর চোখ ভর্তি মেঘনার ঢেউ দেখে জলঙ্গী। নাকটা কাছে নিয়ে টাকা শুকে দেখে।
টাকার গন্ধও ইলিশ মাছের মতো।
বনধ্ শেষ হতে আছে আর এক সপ্তাহ। এই
সাত দিন কাটলেই তো খোলা আকাশের নীচে আবার মাছ ধরতে যেতে পারবে জামাল মিয়া। জলঙ্গী সে-কথাই বললেও জামাল মিয়ার কানে কিছুই ঢুকছে না। সেবুর নৌকা চুরি
করে রাতে ইলিশ ধরার শিহরণ তার গায়ে। কিন্তু বনধ্ শেষে নৌকায় সেবুর আদেশে জাল গোটাতে হাত লাগাবে ভাবতে সায় পায়
না মন।
পরের রাতেও মেঘনায় সেবুর নৌকা ভাসায় আঁশটে
গন্ধের টাকার খোঁজে। কিন্তু ইলিশ সবার সয় না। জামাল মিয়া দুই
গ্রাম পরের বাজারে যতই ইলিশ বেঁচে সন্তর্পনে ফিরে আসুক, সেবুর কানে সেই রাতেই খবর পৌঁছে যায়। ইলিশের চোরাই বাজারে সেবুর লোক থাকবে
না তা কী আর হয়!
জলঙ্গী সেই হিজল গাছটার নীচে আগের রাতের মতো অন্ধকারে বাপজানের নৌকা দেখার আশায় দাঁড়িয়ে।
আধ মিনিট থেকে সময়ের আধাঘণ্টাও কেটে যায়। জলঙ্গীর শীত-শীত
লাগে। আঁচলটা টানাটানি করে বুক-পিঠ ঢাকার চেষ্টা
করে। কিন্তু কাঁধ থেকে যেন আঁচল সরে না। জলঙ্গীর মনে হলে তার কাঁধে এক সাপ গা এলিয়ে
আছে।
‘আল্লাহ গো’ বলে লাফ দেয় জলঙ্গী! বুকে থুতু দিতে-দিতে সামনে তাকিয়ে যেখানে সাপটা পড়ে থাকবে ভেবেছিল সেখানে সে বুকে দাঁড়ানো দেখে।
জলঙ্গীর মোবাইলের টর্চের আলো পড়ে সেবুর হলুদ
দাঁতে।
খবর পাইলাম বনধের কালে তোমার বাপে আমার জালে
ইলিশ ধরতেছে!
সেবু বলে, চাইলে আইজকা কানুন সাথে নিয়াই এখন
ঘাটে আসতে পারতাম। খালি তোমার কথা ভাইবা এখনও তা করি নাই।
জলঙ্গী জানে বাপজানকে জেলে পাঠানোর এই সুযোগ
হারাবে না সেবু। কিন্তু সেবুর মনে কিছু একটা চলছে, সেটা কী বুঝতে হবে।
সেবু অবশ্য রাখঢাক করে না।
বলে, তুমি বললে আমি কাউরে বলবো না। খালি তুমি
নিজের ইচ্ছায় আমার হাতে ধরা দিবা।
জীবনের নোংরা চেহারাটা তো আগেই দেখেছে জলঙ্গী।
সেখানে পেট দিয়ে দুনিয়া চলে। ওই যে মাগীটা তার স্বামীর সাথে শরীরের খেলা খেলত, সে-ও তো আসলে পেটের জন্যই!
জলঙ্গীদের ঘরে কাঁচা টাকা এনে দিয়েছে ইলিশ।
এটা বন্ধ হলে পেট চলবে কী করে! সেবু এককালে বাপজানের নৌকার লোক ছিল। সেই সেবুর লোক
হয়ে জাল ফেলবে না জামাল মিয়া। রাতের অন্ধকারে
নৌকা নিয়ে মেঘনার বুক থেকে ইলিশ ছিনিয়ে নেওয়ার মজায় মজে আছে সে।
কী ভাবতেছো? চোখ সরু করে জলঙ্গীকে দেখে সেবু।
নাহ! জলঙ্গী কিছু ভাববে না। শুধু বাপজান আসার
আগে সেবু চলে যাক, চায় সে।
চার কদমে সেবুর কাছে এসে দাঁড়ায় জলঙ্গী। মেঘনার
বাতাসে আঁচলের কোনাটা কাঁধ থেকে সরে যায়।
সেবু বিশ্রীভাবে হেসে ওঠে। জলঙ্গীকে জাপটে
ধরে। কেন যেন সেবুর হাত পিছলে যায়। সেবু দেখে ঘুটঘুটে রাতে জলঙ্গীর আরও কালো শরীর থেকে ঝিলিক দিচ্ছে রুপালি আভা। সেবু পিছপা হয়।
তবু নাকে ঠেকে আঁশটে বাতাস। জলঙ্গীর গা জুড়ে ইলিশের গন্ধ ভুরভুর করছে।
| শিল্পী: চন্দন মিশ্র |
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন