মাকড়সার জাল
সত্যবান বিশ্বাস
তাদের সরকার
ক্ষমতায় আসার পর বিরোধীদের থেকে স্থানীয় বইমেলাটাকেও ছিনিয়ে নিয়েছেন ননীগোপাল
সাহা। পার্টির লোকাল কমিটির সম্পাদক তিনি। মেলারও প্রধান পৃষ্ঠপোষক।
কিন্তু মেলাটা তেমন জমে না। জমে না
বলতে— আগে যেমন কলকাতা থেকে বড়বড় প্রকাশকরা আসতেন, এখন আর আসেন না।
যা-ও বা দু-একজন আসেন, তাদেরও বিক্রিবাটা তেমন হয় না। পরের
বছর ডাকলেও তাদের আর টিকি খুঁজে পাওয়া যায় না। এলাকার শিক্ষিত লোকজনও মেলা থেকে
মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এখন না যাচ্চে গেলা, না যাচ্ছে উগরানো।
মেলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটাও সেই নিভু নিভু। সবকিছুর মূলেই শুধু ম্যানেজমেন্টর
অভাব। সবকিছু বুঝেও তেমন কিছু করে উঠতে পারেন না ননীগোপালবাবু। আসলে এসব ব্যাপারে
দায়িত্ব দেবার মতো লোকই খুঁজে পান না তিনি। প্রায়
পয়ষট্টি বছর বয়সে একা একা ক’দিকই বা সামলাবেন। তার উপর বেয়াড়া ভুঁড়িটাও আজকাল সব
কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
একদিন এলাকার গণ্যমান্য শিক্ষক সুরেশ হালদারকে ডেকে বললেন, “মাস্টার, যদি
বইমেলা কমিটিতে আসো— মানে, তোমাদের মতো লোকজন এগিয়ে এলেই
মেলাটার একটু শ্রীবৃদ্ধি হয়।”
“আমাকে আবার কেন
এর মধ্যে জড়াতে চাইছেন? তাছাড়া আমি তো—”
“শোনো মাস্টার, বইপড়া লোক কি আর
এখন পার্টিতে আছে?”
“তবে, মেলাটা তো ওদেরকেই
করতে দিতে পারতেন।”
“এই বুদ্ধি
নিয়ে তুমি মাস্টারি করো?”
“না, মানে
বলছিলাম—”
“আরে মাস্টার, বইমেলা হল
বুদ্ধিজীবী ধরার ফাঁদ। শিক্ষিত মানুষকে দলে আনতে বিরোধীরাই এই ফাঁদ পেতেছিল। তবেই
না এতবছর রাজত্ব করেছে।”
সুরেশবাবুর চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাঠজুড়ে পাতা বড় একটা
ফাঁদ। আর মাকড়সার জালের মতো সেই ফাঁদে জড়িয়ে আছে কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদক-শিল্পী-শিক্ষক-সহ
আরও কত কত বুদ্ধিজীবী।
সুরেশবাবু সম্মোহিত হয়ে আস্তে-আস্তে সেই মাকড়সার জালটির দিকে এগিয়ে গেলেন। জালে এখনও যারা
আটকায়নি, তারা দূর থেকে দেখে খুবই মজা পাচ্ছে। হাততালি দিচ্ছে। বেশিরভাগই সাধারণ
মানুষ। সুরেশবাবু দেখলেন, হেঁটমুণ্ড ঊর্ধপদ হয়ে লটকে আছেন একজন লোক। মুখে লম্বা দাড়ি।
কাঁধের ঝোলাব্যাগটা গলায় পেঁচিয়ে আছে কোনওরকমে। সুরেশবাবু লোকটিকে চিনতে পারলেন।
তিনি কলকাতা বইমেলায় লোকটিকে কবিতা পড়তে দেখেছিলেন । হেঁটমুণ্ড ঊর্ধপদ হওয়াতে
প্রথমে চিনতে কষ্ট হচ্ছিল।
তবুও সুরেশবাবু জানতে চাইলেন, “আপনি কে?”
“আমাকেও চিনতে
পারছ না? আমি একজন কবি।”
“এখানে আটকালেন
কীভাবে? তাও আবার হেঁটমুণ্ড ঊর্ধপদ!”
“আমার কবিতাই
আমার এই দশা করেছে!”
“মানে?”
“কবিতা লিখছি
অনেক কাল। তা কবি হিসেবে আমাকে তেমন কেউ চিনল না। এই যেমন তুমিও চিনতে পারোনি।
ভাবলাম, সরকারি অনুগ্রহ পেলে নামডাক হবে। তাছাড়া দু-একটা সরকারি পুরস্কার-টুরস্কার বাগাতে
পারলেও—”
“অমর হয়ে যাবেন!
তাই রাজানুগ্রহ পেতে জালে জড়িয়ে পড়লেন।”
“ঠিক বলেছেন, কিন্তু আস্তে বলুন।
কেউ শুনে ফেললে আমার কাজটাই হাতছাড়া হবে!”
“তা কী কাজ করতে
হয় আপনাকে?”
“এই যেখানে মেলা
বা কোনও সভা-অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে এমনই হেঁটমুণ্ড ঊর্ধপদ করে ঝুলিয়ে রাখে আমাকে।”
“ব্যস?”
“না না, আরও কত কাজ!”
“যেমন?”
“মেলা বা
সভাগুলোতে আমাকে মহামান্য সরকারের পক্ষে গরম-গরম বক্তৃতা
ঝাড়তে হয়।”
“আর আপনার কবিতা?”
“এই অভিমানে আমার
কবিতা আমাকে ছেড়ে পালিয়ে গেছে!”
“তাহলে আপনি
কেমন কবি? কবিতা না-লিখলে আবার কেউ কবি হয় নাকি?”
“আমি এখন
সরকারের শেখানো বুলিই আওড়াই। সরকারের বক্তৃতায় কোথাও ছন্দ এসে পড়লে পাশে বসে তার
সাথে ছন্দে ছন্দে গলা মেলাই!”
“বা বা বা!”
“তবে কী জানেন, বুদ্ধিজীবী হিসেবে
বেশ মান্যতা পাই এখন।— এটা কিন্তু খারাপ লাগে না।
তাছাড়া ভাতাটাও তো কম না, সেটাও তো দেখতে হবে। কী বলেন?”
“তা তো বটেই!”
“এই দেখেন, আপনাকে এত কথা
বলতেই বা যাচ্ছি কেন? আপনি আবার এসব কথা
পাঁচ-কান করবেন না। কাজটা গেলে একেবারে না-খেয়ে মরব দাদা!”
“না না, সে আপনি নিশ্চিন্ত
থাকতে পারেন।”
“অভয় দিচ্ছেন?”
“নিশ্চয়ই।”
“তাহলে শুনুন, এই যে পাশে যে-লোকটা
ঝুলে আছে, সে একজন সম্পাদক। একজন ভালো সাহিত্যিকও।”
“খুব ভালো, খুব ভালো!”
“আরে ভালো না
ছাই! ওর এখনও ভাতাটাও চালু হয়নি। তাও ঝুলেই যাচ্ছে।”
“খুবই দুঃখজনক!”
“অথচ, লোকটার চাহিদা ছিল
খুবই সামান্য। পত্রিকাটির রেজিস্ট্রেশান করতে চেয়েছিল। আর আশা করেছিল, দু-একটা সরকারি বিজ্ঞাপন। আর তার জন্য সরকারের তোষামোদ করে লিখতে-লিখতে এখন
পত্রিকাটাই সরকারি দলের মুখপত্র হয়ে গেছে। তবু্ও রেজিস্ট্রেশান পায়নি।”
“কেন?”
“আরে, আগে তো ও
সরকারের সব কিছুতেই বিরোধিতা করে লিখত। সে-ভূতটা এখনও ওর জ্যান্ত আছে কি না— তা দেখে
নেবে না সরকার?”
“হ্যাঁ, তা-ও তো ঠিক!
সরকার কি আর—?”
“আরে আমিও তো
তাই বলি, তুমি সরকারের সব সুযোগসুবিধা
নেবে আর নিজেকে সরকারের লোক হিসাবে প্রমাণ করবে না— তাই কখনও হয়?”
সুরেশবাবু দেখলেন, সম্পাদকমশাই আড়চোখে তাকে দেখছেন।
দেখতে-দেখতে খৈনি ডলছেন, আর মিটমিট করে হাসছেন। কবিমশাই সম্পাদকের দিকে তাকিয়ে
বললেন, “এই জন্য ও আজ পর্যন্ত বুদ্ধিজীবী তকমাটাই পেল না।
কতবার বলেছি, খৈনি ছেড়ে একটা ভদ্রস্থ নেশাটেশা করতে। তা কে
শোনে কার কথা!”
পাশে এক জায়গায় অনেকে একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। সুরেশবাবু একটু এগিয়ে
দেখতে গেলেন। একটা লোক তার চারপাশে রং করে নিয়ে বসে আছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না লোকটি
চিত্রশিল্পী। যা-কিছু এঁকেছেন সব একই রঙে। সুরেশবাবু জানতে চাইলেন, “সব একই রকম রং কেন? আপনার কি অন্য রং
পছন্দ নয়?”
“অন্য রং পছন্দ
করে মরি আর কী, আমার কাজটা খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে আপনার!”
“মানে?”
“দেখছেন না, এগুলো সব সরকারি রং।
এ-রঙের বাইরে যাওয়ার কি অধিকার আছে আমার?”
“তাহলে আপনি
কিসের আর্টিস্ট?”
“ইচ্ছেখুশিমতো
রং অনেক ব্যবহার করেছি। তখন তো আমার খাওয়াই জুটত না। বউয়ের টিউশনির টাকায় খেয়ে না-খেয়ে
সংসার চলত। তখন কোথায় ছিলেন আপনি? কোথায় ছিল আপনার শিল্পবোধ? বড় রং চেনাতে
এসেছেন!”
“আহা! রেগে
যাচ্ছেন কেন?”
“ভেবেছিলাম, এবার রঙটাকে বদলে
নেব। কিন্তু পারলাম কই?”
“কেন পারলেন না?”
“এখন আমার এই
একরঙা ছবিই কত বড়বড় গ্যালারিতে জায়গা পায়, কত কত টাকায় বিক্রি হয়, পারবেন আমাকে সেই সুবিধা দিতে? পারবেন না! তাই আমি
সরকারের পছন্দের রঙেই সবকিছু রাঙিয়ে
দিই।”
ইশারায় সুরেশবাবুকে কাছে ডেকে নিলেন কবিমশাই। বললেন, “আপনার ওদের
বিরক্ত করে লাভ কী? যে যা-করছে, করতে
দিন। শুধু কি ও? তার পাশে দেখুন সংগীতশিল্পী, একটু দূরে সিনেমা-সিরিয়ালের পরিচালক।
সরকার বাহদুর এখন নিজেই গান লিখে সুর করে দেন। সেই গানই
শিল্পীকে গাইতে হয়। নিজের শেখা বিদ্যা ওর কোনও কাজে লাগে না। ও এখন বঙ্গ সংগীতমেলার
সভাপতি।
সরকারের বিপক্ষে
গেলে কোনও সিনেমা-সিরিয়ালকে সেন্সরবোর্ড আর ছাড় দেয় না। তাই সবাই এই জালে আটকে আছে।
কেউ নিজের ইচ্ছায়, কেউ বাধ্য হয়ে।”
সুরেশবাবু সিনেমার লোকটিকে দেখেন। মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। কেমন
একটা অদ্ভুত পোশাক পরে আছে। চোখে বেশ মোটা ফ্রেমের চশমা। কবিমশাই বললেন, আগে থিয়েটার-ফিয়েটার
করত। খুব প্রতিবাদী বুলি আওড়াত। তারপর পথে এসেছে বাবাজি। অনেকদিন ঝুলে ছিল। এবারই
সরকারি খরচে একটি সিনেমা করার বরাত পেয়েছে। ভাগ্য খুলে গেছে! জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারটাও
পেয়ে যাবে।”
“কিন্তু, এমন অসৎভাবে সবকিছু
পেতে আপনাদের খারাপ লাগে না?”
“আরে মশাই, নিজেকে খুব সৎ ভাবেন আপনি, তাই তো?”
“কোনও সন্দেহ আছে?”
“আসলে আমরা কেউই
সৎ না। যে নিজেকে সৎ ভাবছে, সে আসলে অসৎ হবার সুযোগ পাচ্ছে না তাই সৎ।”
“মানে? কী বলতে চাইছেন
আপনি?”
“একটু বামে
তাকিয়ে দেখুন, আপনার মতো কত মাস্টার ঝুলে আছে এই জালে!”
সুরেশবাবু
দেখলেন, সত্যিই তাই! একসাথে সংগঠন করেন— এমন অনেককেই দেখতে পেলেন। চিনতে পারলেন।
তিনি ভাবতেও পারছেন না তলে-তলে এরাও কি না! ছিছিছি!
সুরেশবাবু নিজেও একবার ভেবেছিলেন রঙটা বদলে নেবেন। কিন্তু
মন থেকে এখনও মেনে নিতে পারেননি। পারলে এতদিন পঞ্চায়েত অফিসে ছেলের চাকরিটা পাকা
হত। তিনিও জেলাপরিষদের
টিকিটটা পেয়ে যেতেন। এমন ভরসার কথা ননীগোপাল সাহা-ই তাকে একদিন শুনিয়েছিলেন।
রং বদলের
ভাবনাটাকে মাথায় পুরে ছাদেই পায়চারি করছিলেন সুরেশবাবু। ছোট্ট একটা ছাদবাগান আছে
তার। সেখানে নানা প্রজাতির শখের গাছ লাগিয়েছেন। হঠাৎ দেখলেন, একটি কমলা রঙের
গিরগিটি সবুজ পাতার মধ্যে চুপটি করে বসে আছে। অনেকক্ষণ লক্ষ করে বুঝলেন, গিরগিটিটির রঙ বদল হচ্ছে না। অবাক হলেন তিনি। একটু কাছে গিয়ে আদর মাখিয়ে
বললেন, “কীরে রং বদলাসনি যে?”
“মানুষের রং
বদলানো দেখে লজ্জা পেয়ে গেছি বাবু!”
“মানে?”
“রং বদলানোতে এতদিন
আমাদেরই একচেটিয়া অধিকার ছিল। রং বদলের কোনও ঘটনা ঘটলেই সবাই আমাদেরকেই উপমান করত।”
“ঠিকই তো!”
“মানুষ আমাদের সেই জয়ের মুকুট কেড়ে
নিয়েছে বাবু। এখন আমরা এক ফুল থেকে অন্য ফুলে যেতেও ভয় পাই!”
হুবহু মানুষের
মতো কথাগুলো শুনতে পেলেন সুরেশবাবু। তিনি লজ্জিত হলেন। এবং রং-বদলের
সংকল্প মন থেকে ত্যাগ করলেন। তবে তিনি এখন কোন রঙে আছেন কেউই ঠিকঠাক বুঝতে পারে না।
কবিমশাই বললেন, “কী, আমার কথা
খুবই খারাপ লাগল বুঝি? সময় আছে এখনও
ঝুলে পড়েন।”
সুরেশবাবু কবির
কথার কোনও উত্তর দিলেন না। ঘুরে-ঘুরে দেখতে লাগলেন আরও কে কে আটকে আছে জালে। দেখতে-দেখতে
তিনি হটাৎ আৎকে উঠলেন, তিনি নিজেও আটকে আছেন এই জালে! কবির মতো হেঁটমুণ্ড ঊর্ধপদ!
চুপ করে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন, ভালোয় ভালোয় পেনশনটা হয়ে যাক,
তার আগে কাউকে কিছু বলবেন না। এই
ভাবেই লটকে থাকবেন। একেবারে হেঁটমুণ্ড ঊর্ধপদ হয়ে। ছেলের চাকরিটা যতদিন না পাকা
হচ্ছে...। তাছাড়া শেষ বয়সে একটা শিক্ষারত্ন-টত্ন পেলে ক্ষতি কী?
ননীগোপাল সাহা এতক্ষণে বললেন, “কী ভাবছ মাস্টার?
একেবারে চুপ মেরে গেলে যে!”
তড়িঘড়ি যেন ঘুম
ভেঙে উঠে সুরেশবাবু বললেন, “আপনার কথা কি আর ফেলতে পারি মশাই?”
| শিল্পী: চন্দন মিশ্র |
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন