শনিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২২

ছোটগল্প: ফসলের ঘুম: অয়ন ভারতী

ফসলের ঘুম
অয়ন ভারতী

ধানগাছগুলো দুলছে। এখনও আলো ফোটেনি পুরোপুরি। আবছা অন্ধকার ঢেকে রেখেছে চারপাশকে। ওসমানকে প্রতিদিন এইভাবেই রাত থাকতে মাঠে আসতে হয়। পটল চাষ করলে চাষিদের ভোররাতে ওঠা ছাড়া আর কোনও গতি থাকে না। তাই এই আবছা অন্ধকার কাঁধে ওসমান জমিতে এসে দাঁড়িয়েছে। চাষিদের দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার অনেক আগেই একটু দূরের খেতে যেমন কুতুব ও তার দুই ছেলে-মেয়ে পটলের ফুল ছোঁয়াচ্ছে। কুতুব ওসমানেরও আগে আসে। ছোটো ছেলেটা ঠিকঠাক ফুল ছোঁয়াতে পারছে না বলে কুতুবের কাছে ধমক খায়। ওসমান অবশ্য একা একাই আসে। তাছাড়া ওর আর কোনও উপায়ও নেই। রাত তিনটে বাজতে-না-বাজতেই ওসমানের বুড়ি মা ‘বাপ’ বলে চিৎকার করে ওঠে। একটা চিৎকারেই ওসমানের ঘুম ভেঙে যায়। ছেলেকে ডাক দিয়ে বাদলি তখন ঝিমোতে থাকে। বয়স হয়েছে বলে সে আর রাত থাকতে জমিতে আসতে পারে না। ভোরের শিশির এখন আর সহ্য হয় না। পাশের ঘরে তালেব তখনও ঘুমায়। খেতে এসে নিচু হয়ে ফুল ছোঁয়াতে-ছোঁয়াতে ওসমানের কানে ‘বাপ’ শব্দটা কেবল ওঠানামা করতে থাকে। পরিবারের সাহায্য বলতে ওসমান এটুকুই বোঝে। ত্রিশ বছরের ওসমান এখনও বিয়ে করে উঠতে পারেনি। সে তার ছোটো খেতটার দিকে চেয়ে থাকে। পাশাপাশি বিঘে তিনেক জমিতে সে ধান আর পটল করেছে। কুতুবের মতো বড়ো চাষ তার নয়। বিঘেখানেক জমির পটলখেত। ছোঁয়াতে বেশি সময় লাগেও না। তবুও ওসমানের দেরি হয়। ভোরবেলার এই সময়টুকু ওসমানের বড়ো ভালোলাগে। খেতে এসে ও তাই জমির আলের উপর কিছুক্ষণ বসে থেকে চারপাশটা দেখে। ভোর হওয়ার আগের এই সময়টার আবছা আলোয় চারপাশ দেখতে-দেখতে ঘোর লেগে যায় ওসমান নিজের লাগানো ধানগাছগুলোর দিক তাকিয়ে থাকে। হাওয়ায় শীষ সমেত ধানের গোছাগুলো দুলছে। গাছগুলো দোলার কারণে কয়েক ফোঁটা শিশির নিজেদের ভারসাম্য রাখতে না-পেরে গড়িয়ে পড়ছে। ওসমান গাছগুলোর দিকে তাকিয়েই থাকে। কত যত্নের, স্বপ্নের এই গাছ। চাষির মরণ-বাচন। সে পরম মমতায় গাছগুলোর গায়ে নিজের আঙুল বুলিয়ে দেয়। জমে থাকা শিশিরে ওসমানের মাটি মাখা আঙুলগুলো ভিজে যায়। ধান প্রায় পেকে এসেছে। আর কয়দিন পরেই শুরু হবে ধান কাটা। ওসমানদের গ্রামটায় তখন কী ব্যস্ততা পড়ে যায়! সেই মুর্শিদাবাদ থেকে মুসলমান ছেলেরা চলে আসে ধান কাটার জন্যে। কুতুবের জমিতেই সবচেয়ে বেশি লোক খাটেতার বিশ বিঘের উপর ধানের চাষ। সারাদিনের পরিশ্রমের পরে সন্ধ্যায় কুতুব মিয়ার উঠোনটা কিষাণ কামলাদের গুলতানিতে ভরে যায়। কত কথা, গান সেসময় ভরে রাখে কুতুবের বাড়ি। গোটা উঠোনটা মুনিষদের কথায় ডুবে যায়। কাটা ধানগাছে ছেয়ে যাওয়া উঠোনটা তখন লণ্ঠনের আলোয় রূপকথার মতো দেখায়। যেন কোনও এক দরবেশ এসে উঠোনময় তার কুপির পবিত্র আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। গোয়ালঘরের পাশের জামগাছটা ঘিরে তখন জোনাকি ওড়ে। যেন এই রূপকথার উঠোন ছাড়া তাদের আর কোনও গন্তব্য নেই। গোটা মুসলমান পাড়াতেই তখন উৎসব লেগে যায়। ধান কাটা, ঝাড়াই সবকিছু নিয়ে চাষিদের উঠোন তখন দিনরাত চোখ মেলে থাকেভোরের আবছা আলোতে ওসমানের চোখে সেই উৎসবের স্বপ্ন ভাসে। কুতুব মিয়া তার খেতের কাজ শেষ করে এনেছে। এবার সে তার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিটা পরে  মসজিদে যাবেকুতুব রোজ এই সাদা পাঞ্জাবিটা পরে। সঙ্গে সাদা টুপি। মসজিদের মোয়াজ্জেম সে। সাদা পোশাক পরা কুতুব যখন আজান দেয়, তখন সবাই মুগ্ধ হয়ে শোনে। আজান শেষ হবার পরে কুতুবের চোখ দুটো কেমন আবেশমাখা হয়ে ওঠে। যেন কত জন্মের না-পাওয়া উত্তর তার চোখের ভিতর জমে উঠেছে। কুতুবের ছলছল করা চোখ দেখে মসজিদে তখন নীরবতা নেমে আসে। ওসমান মাঝেমধ্যেই ভাবে সেও মসজিদে গিয়ে নামাজে যোগ দেবে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। সূর্য ওঠার আগের এই সময় ওসমানকে বিভোর করে দেয়। কুতুব যখন আজানের সুর তোলে, তখন ওর এই বিঘের পর বিঘে ছড়িয়ে পড়া জমি দেখতে ভালো লাগে।  ওসমান উঠে পটলের খেতে নেমে আসে। পটল আগে ওসমানরা কোনোদিন করেনি। আব্বা তাহের যদ্দিন বেঁচে ছিল কেবল ধান আর পাট করে সংসার চালিয়েছে। গত দু-বছর ধরে ওসমান পটল করছে। পাট লাগাবে না একথা শুনে ওসমানের বুড়ি আম্মু কিছুক্ষণ খুব চিল্লামিল্লি করেছিল। চেঁচাতে-চেঁচাতে একটা সময় বুড়ির গলা দিয়ে আর আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। হাঁপাতে-হাঁপাতে ক্রমশ গুটিয়ে যাচ্ছিল আম্মু। অনেকটা ছোটবেলায় কেনা সেই দম ফুরিয়ে যাওয়া পুতুলটার মতো। ওসমান সেসব কথায় কান দেয়নি। বাপ কোনোদিন ওসমানকে জমিতে নিয়ে যেতে চাইতো না। জমিতে গেলে যে হা করে ধানগাছের দিক তাকিয়ে থাকে, তাকে নিয়ে কোনো কাজ হয় না। বাড়ি ফিরে তাহের বলতো, ‘তোমার ওসমানরে আর মোর সাথে জমিতি নিতি বলবা না। খালি খেতের দিক তেইকে থাকে তারপর ওসমানকে উদ্দেশ্য করে বলত, ‘শুধু তেইকে থাকলি হবে না বাপ। কামও করতি হবে। শুধু ভাবলি চাষ হবে না’ বাপের এই কথা ওসমানের বোধগম্য হত না। মাঠের পর মাঠ কচি ধানগাছ দেখে কেউ কী করে না-তাকিয়ে থাকতে পারে! তা যেন কচি ছেলের শরীর গো! তুমি যদি দূর থেকে দেখো মনে হবে জমির পর জমি সব সবুজ ঘাসে সমান হয়ে গেছে। ইচ্ছা করলে এর উপর দিয়ে হাঁটতে পারো, ছুটতে পারো। আর যদি পেকে যাওয়া ধানগাছের কথা বলো তাকে, ওসমানের মনে হয় কোনও ভরন্ত পরিবারের মতো। নিচু হয়ে পটলের সাদা সাদা ফুলগুলোকে ছোঁয়াতে-ছোঁয়াতে ওসমান এসব ভাবে। গতবছর ওসমান পটলে ভালো লাভ করেছিল। এবারও বাজার ভালো। ড্রপার দিয়ে ফুল ছোঁয়াতে-ছোঁয়াতে ওসমান থমকে যায়। আলের ধারে একটা পাকা পটলের অর্ধেক পড়ে আছে। ওসমান সতর্ক হয়। পাকা পটল গোখরো সাপের খাবার। সে অবশিষ্ট পটলের টুকরোটা তুলে মাঠের বাইরে ফেলে দেয়। একটু দূরেই ফেলে। পটলখেতের আশেপাশে গোখরো সাপের আস্তানা থাকে। সেই বন্যার বছর পরপর দুই রাতে মুসলমানপাড়ার দুইজনকে গোখরোয় ছোবল মেরেছিল। এরমধ্যে আনছুর চাচাকে ছোবল মেরেছিল তাহেরের সামনেই। বাড়ি ফিরে উঁচু দাওয়ায় ঠেস দিয়ে বসে তাহের হাঁপাচ্ছিল আর বলছিল, ‘মুই তো এইজন্যিই পটল করতি চাইনে। পটলের আল জাত সাপের ঘরবাড়ি আব্বার চোখে তখন ভীষণ ভয়। সাপের ছোবল মারার ছবিটা হয়তো বারবার মনে পড়ছিল। আব্বা তখন ওসমানের দিক আড়চোখে তাকাচ্ছিল। মাটির দিক চেয়ে থাকা ওসমানের ভাবান্তর লক্ষ করছিল। হয়তো ওসমানের চোখে তাহের পটল চাষের নিবৃত্তি খুঁজছিল। ওসমানের চুপচাপ ঘাড় গোঁজা ভঙ্গি তাহেরকে হয়তো তখন ভরসা দিচ্ছিল। কিন্তু নিবৃত্তি বড়ো ক্ষণস্থায়ী। তাহেরের বেঁচে থাকা পর্যন্ত ওসমান চাষী হতে পারেনি। এমন করে পরিবারের ভরসা হয়ে জমিতে আসতে পারেনি।

      মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আজানের সুরছড়িয়ে যাচ্ছে খেতের পর খেত। ভোরবেলার এই আজান বড়ো সুন্দর, পবিত্র। আযানের সুর ওসমানকে উদাস করে দিচ্ছে। একটা সাদা বক তার জমির আকাশে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। কুতুবের আযান শুনতেই যেন তার আসা। শেষ হলেই সে উড়ে যাবে অন্য কোথাও। ধানজমির পাশে যে হাতখানেক চলার পথ, সেখানে সে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। নামাজ পড়তে-পড়তে ওসমানের চোখ বুঁজে আসে। মাটির গন্ধ নিতে-নিতে তার চোখের সামনে পেকে যাওয়া ধানের গোছা দুলতে থাকে। তার অল্প অল্প ঘাম জমা শরীরে তখন প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়েছে। 

চারদিকে এখন আগুন রোদওসমানের শরীরটা তাপে পুরো ঝলসে গেছে। একটু আগেই সে পটলহাটের থেকে ফিরেছে। পটলের বাজার এখন জমজমাট। গত দুই হাট থেকে বাজার আরও চড়েছে পটলের ফলনও এবার খুব জোরদার। দাওয়ায় বাঁশের খুটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকায় ওসমানের এখন ঘুম পাচ্ছে। অথচ তার এখনও খাওয়া হয়নি। তার উপর মহাজন আজ পুরো টাকাটা দেয়ওনি। অল্প জমির চাষ হলে মহাজনরা তাদের ঘোরায়ও বেশিতার মতো ছোট চাষিদের সুখ নাই। চিন্তার অন্ত নাই। বাপ তাহেরকে সে আজীবন কেবল জমি চষে সুখ, আরাম খুঁজতে দেখেছে। তার বাপ বলতো চাষিদের সুখ কেবল খেত থেকে বাড়ির উঠোন পর্যন্ত। উঠোন ছাড়িয়ে যেই তুমি বাজারের পথে পা রাখলে অমনি সব গেল। বিড়ি টানতে- টানতে তাহের বলতো, ‘যেই তুমি বাজারে গেলে অমনি সব যেন তোমার থেকি কোথায় পেইলে গেল। কানাভুয়োর মতো তোমারে কেবল ঘুইরে মারবে ওসমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঘুরেফিরে কেবলই আব্বার কথা মনে পড়ে যায়। তার আব্বার একটা উপস্থিতি সে সবসময়ই তার আশেপাশে টের পায়। মরে গিয়েও তাহের আলি ওসমানের ওপর যেন সবকিছু ছাড়তে পারছে না।

আম্মু, বড়ভাই কাউকেই ওসমান বাড়িতে দেখতে পাচ্ছে না। বেলা হয়েছে। আম্মু কোথায় কে জানে। তার এখন প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। পেটটার ভিতর কেউ যেন হাত ঢুকিয়ে সব বের করে নিয়েছে। এমন খালি পেট ওসমানের। এসব ভাবতে- ভাবতে খুঁটিতে হয়তো ওসমান একটু বেশিই হেলান দিয়ে ফেলেছিল। কারণ খুঁটিটা একটু শব্দ করে উঠেছে। সে সোজা হয়ে বসলআব্বা বেঁচে থাকতে সেই সিরাজুল চাচার কাছ থেকে পাকা বাঁশ এনে খুঁটি করেছিল। সেই খুঁটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় ঘুন ধরেছে বলে বাঁশের গুঁড়ো ঝরে-ঝরে পড়ে। এইবছর বর্ষা আসার আগেই ঘরটার মেরামত করতে হবে। চালের অবস্থাও ভালো নাটালি ভেঙেছে বেশ কয়েকটা। কয়েকটা ফুঁটোও হয়েছে। বৃষ্টি হলেই জল চুইয়ে পড়ে। যে রাতে খুব বৃষ্টি হয়, তার পরেরদিন উনুন ধরাতে হিমশিম খেতে হয়। ধোঁয়া আর আম্মুর কাঁশির আওয়াজে রান্নাঘরটা তখন কেশো রোগীর মতো কাঁপতে থাকে। তার উপর বর্ষায় টালি ভিজে ভারী হয়ে যায়সেই ভার এই ঘুনধরা খুঁটির পক্ষে সামলানো সম্ভব হবে না। টালি তাকে খুব বেশি কিনতে হবে না। গোয়ালঘরটার থেকেই পেয়ে যাবে বেশ কিছু। আম্মু চাইলে বাবুর ছোট একচালা ঘরটা ভেঙেও টালি নিতে পারে সে। বছর দুয়েক হল গোয়ালটা ফাঁকা পড়ে আছে। আব্বা যেবছর বিছানায় পড়ল, সেই বছরই হালের বলদ দুটো বেঁচতে হয়েছিল। বলদ বেঁচেছিল ওসমান আব্বার চিকিৎসার জন্য। রোদেজলে তাহের আলির দশ বছরের উপরের সঙ্গী বলদ দুটো। বেঁচে থাকার জন্য তাহের গরু বেঁচায় না-করেনি, তবে বলদ দুটো যাওয়ার সময় তাহেরের প্রাণটাও যেন নিয়ে চলে গেছিল। তারপরেও একটা গাভীন গরু ছিল। রোজ ছয় কেজি মতো দুধ দিতো। আব্বা মারা যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে গাভীনটাও গেল। গাভীনটাকে গোদান ভূতে ধরেছিল। গোরুটার খুব খাই ছিল। বিচুলি জুগিয়ে পারতো না ওসমান। তার ওইটুকু জমিতে আর কতটাই বা বিচুলি হয়। তাছাড়া বর্ষার সময় কী খাবে সেই ভেবে বিচুলি কিছু জমিয়েও রাখতে হতবাড়িতে সারাদিন বাঁধা থাকলে গাভীনটা তাই না-খেয়ে সিঁটকাতো আর গলা ছেড়ে ডাকতওসমান একটু রোদ চড়লেই গাভীনটাকে বনেবাদাড়ে রেখে আসতহিন্দুপাড়ার মল্লিকদের বাড়ির পিছনে যে জঙ্গল মতো আছে সেখানে সেই দুপুরে মাদার গাছের সঙ্গে গরুটাকে বেঁধে রেখে এসেছিল ওসমান। সেই যে রেখে এল তারপর আর গাভীনটা গোয়ালে ফিরল না। মাদার গাছের নীচেই তাকে গোদানে ধরলো। বিকেলবেলা মোবারক খবর দিতেই ওসমান পড়িমরি করে ছুটেছিল জঙ্গলে। বেঁধে রাখা স্থান থেকে বেশ কয়েকহাত এগিয়ে গরুটা ঘাড় মটকে পড়ে ছিল। কমসেকম একহাত গর্ত করে গাভীনটার মাথাটা পুতে দিয়েছিল গোদান। ঘাড় মটকে পড়ে থাকা গাভীনটার মুখ হা হয়ে চোয়ালের দাঁতগুলো বের হয়ে ছিল। চোখ দুটো মাদার গাছের মগডালের দিক মেলা। আশপাশের বেশ কিছু জায়গার মাটি উঠে গেছিল। খুরের আঁচড়। মরবার আগে গোদানের সঙ্গে খুব লড়েছিল গাভীনটা। ছয় কেজি করে দুধ দিততাগদ ছিল শরীরে। আশেপাশে কিছু বুনোলতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। মরবার আগে এগুলো গেলার সময় পায়নি। গাভীনটার হা-করা মুখটা দেখে ওসমানের গোয়ালে জমা করা বিচুলিগুলোর কথা মনে পড়ছিল। 

‘কখোন এইঁচিস? ওসমান চোখ মেলে তাকাল। ভাবতে-ভাবতে সে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। আম্মু  বড়ভাই তালেবকে ধরে দাওয়ায় তুলছে। পুকুর থেকে ফিরেছে। তালেবের সারা শরীর জলে ভেজা। সপ্তাহে একদিন তালেবকে পুকুরে নিয়ে যেতে হয়। সেইদিন সে ভালো করে চান করে। বড়ভাই এখন ওসমানের দিক ফিরে আছে। তার গাল গড়িয়ে জল পড়ছে। তালেবের সারা মুখ জুড়ে ঘায়ের দাগ। ছোটবেলায় ওসমান একবার আম খাওয়ার বায়না করেছিল। তখনও বড়ভাই অন্ধ হয়নি। ওসমানের বায়না মেটাতে তালেব গেছিল বলদে বাগানে। কলসার মিয়ার বিশাল বড়ো আমের বাগান। দিনরাত মাচায় বসে বাগান পাহারা দেওয়া হয়। এসব জেনেও তালেব দুপুরে আম পাড়তে গেছিল। কারণ দুপুরবেলা পাহারা দেওয়ার লোকটা বসে-বসে ঝিমোয়। তার ভাইটার খুব আম খাওয়ার লোভ। আব্বার সেদিকে একটুও নজর নেই। চুরি করে আম পেড়ে তালেব যখন গাছ থেকে নামছিল, তখন দেখেছিল ওর সামনেই কলসারের ছেলে মকসুদ দাঁড়িয়ে। তালেবের হাতে ধরা আমের বোঁটা থেকে তখনও কষ ঝরে পড়ছে। মকসুদ আম কেড়ে নেয়নি বটে তবে আরেকটা আম ছিঁড়ে তার কাঁচা কষ তালবের সারা মুখে ডলে দিয়েছিল। তারপরই তালেবের সারা মুখে ঘা হয়ে গেল। ঘা সেরে গেলেও তার দাগ এখনও তালেবের মুখে রয়ে গেছেআব্বা সেই বছরই বাড়ির উঠোনে দু-দুটো আমের চারা লাগিয়েছিল। ধনি গেরস্থ কলসারের বিরুদ্ধে আব্বা এটুকুই যা রাগ-দুঃখ সামর্থ্য উগড়ে দিয়েছিল। আর সেই আমের চারা যখন বড় হল, আম ধরার সময় হল সেইবছরেই বড়ভাই অন্ধ হয়ে গেল। সন্ধেবেলা মশা তাড়ানোর জন্য রোজ তালেবকে গোয়ালঘরে মশালের ধোঁয়ায়  রেখে আসতে হতো। সেদিনও তালেব আম্মুর উনুনের আগুন থেকে ন্যাকড়া বাঁধা মশালটা ধরিয়ে গোয়ালে গেছিল। গরুটার পিছনে নিচু হয়ে বড়ভাই যখন মশালটা নিয়ে এদিক-ওদিক দেখছে, তখনই সাদা বলদটায় লেজের ঝাপটা মেরেছিল। সেই লেজের ঝাপটাতেই বড়ভাইয়ের চোখ খারাপ হয়ে গেল। অন্ধ হয়ে যাওয়ার অনেকদিন পরে তালেব একমাত্র যে আক্ষেপ বড় করে করেছিল তা হল, সে আর কোনোদিন সুর করে দাওয়ায় বসে কোরান পড়তে পারবে না। মসজিদেও সে কোনোদিন মোয়াজ্জেম হতে পারবে না। বড়ভাইয়ের দিক তাকিয়ে ওসমান গভীর বেদনা অনুভব করে। বড়ভাই কোরান পড়তে পারে না একথা মনে পড়লে তার ভীষণ দুঃখ হয়। ওসমান চাষ করে ফসল ঘরে আনছে এই দৃশ্যও বড়ভাই দেখতে পারে না। ওসমান আমগাছ দুটোর দিকে তাকালগাছ দুটোর সেরকম বাড় হয়নি। আব্বার উঠোন ছোট, গাছও ছোট। বড় হলেই বরং বেমানান লাগত। তাদের মতো গরীব চাষির উঠোনে খুব বেশি ছায়াও ঠিক মানায় না৷ রাস্তা দিয়ে মকবুলের নতুন বিবি হেঁটে যাচ্ছে। মাথায় খাবার নিয়ে চলেছে। এই দুপুর রোদে মকবুল এতক্ষণে বড়ো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে নিশ্চয়ই তার জমির আলের কাছে কচাগাছটার নীচে বসে বিবির অপেক্ষা করছে। বিবিকে পাশে নিয়ে ভাত খেতে-খেতে মকবুলের শরীর থেকে সব রোদ ঝরে যাবে। ছায়ায় বসে মকবুল তখন বিবির কাছে ফসলের গল্প করবে। বিবি আর প্রায় পেকে যাওয়া ধানের দিক তাকিয়ে মকবুলের তখন সুখের অন্ত নাই। সে তখন গুনগুন করে গান করবে। তারপর বিবি যখন বিদায় নেবে, তখন আবার মকবুল কাস্তে হাতে করে খেতে নেমে যাবে। তার বুকে তখন দশ মানুষ সমান জোর! এই দৃশ্য কল্পনা করতে- করতে ওসমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মাঝে মাঝে মনে হয় ঘরে একটা বিবি থাকলে বেশ হত এরকম দুপুরে ওসমান খেতে বসে বিবির অপেক্ষা করত। বিবিকে পাশে বসিয়ে সামনের খেত দেখিয়ে ওসমান চাষের গল্প করতো। বিবির হাতটা ধরে সে তখন বলতো, ‘দেখো বিবি, হতি পারে মোর জমি-জিরেত বেশি নাই। মুই ছোট চাষিকিন্তু এই চাষ মোর প্রাণ গো বিবি একটা বিবি থাকলে বেশ হতো। তার শরীর থেকেও সব রোদ, ঘাম ঝরে যেত। নতুন নতুন কথায় বাড়িটা যেন আবার জান পেতআব্বার ভূতটাও এমনভাবে ওসমানকে জ্বালাত না।

বাবুর ঘরটার মরা চালের উপর একজোড়া কানাকুয়ো হেঁটে বেড়াচ্ছে। ময়লা ঘেঁটে-ঘেঁটে খাবার খুঁজছে। আজ বছর তিনেক হল ঘরটা ফাঁকা পড়ে আছে। সেই যে এক সন্ধ্যায় বাবু থমথমে মুখে বাড়ি ফিরল, তারপর সেই রাতেই সে গ্রামছাড়া হল। হিন্দু-মুসলিম দুই পাড়াকেই অবাক করে, কিছুটা অপরাধবোধে ডুবিয়ে বাবু এলাকা ছেড়েছিল। মুসলিমপাড়ার অন্য ছেলেদের থেকে বাবু ছিল একেবারেই আলাদা। শৌখিন, সাফসুতরা। হিন্দুবাড়ির ছেলেদের মতো সবসময় শার্ট, প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াত।

লুঙি সে পরতোই না। রাতে ঘুমানোর সময়ও তার পরনে হাফপ্যান্ট। তার ইয়ারদোস্তও ছিল সব হিন্দুই। আব্বা তাহের তার এই বাবুগিরি নিয়ে খুশি ছিল না। সে ছোট চাষি। তার ঘরে অত চেকনাই, জুলুস ভালো দেখায় নালোকের নজর পড়ে, পাঁচজনে পাঁচকথা কয়। আম্মাকে তাহের মাঝেমধ্যে অভিযোগও করতবাবু পাত্তা দিত না। দিনরাত সিনেমা বাজার করে বেড়ানো বাবুর অত কথা কানেই যেত না। রান্নাঘরের সোজাসুজি সে একটা ঘরও তুলেছিল নিজের জন্য। সেই ঘরে সে মাথার উপর রঙিন কাপড়ের শামিয়ানা টানিয়েছিল। জানালায় পর্দাও দিয়েছিল। তাদের পাড়ার নাজুদের বাড়ির পর থেকেই হিন্দু পাড়ার শুরু। বাবুর যাতায়াত ছিল খুব। এত ঘনঘন যাওয়ার আরেকটা কারণ বোধহয় রূপা। তার সঙ্গে বাবুর ভাব ছিল। ওসমান প্রায়ই জমিতে কাজ করতে-করতে দেখতে পেত রূপার সঙ্গে বাবু জমির শেষ কিনারের আমগাছটায় ঠেস দিয়ে গল্প করছে। শৌখিন বাবুর কথায় রূপাকে হেসে ওসমান কতবার গড়িয়ে পড়তে দেখেছে। গরিব মায়ের নামে কলঙ্ক থাকায় রূপার সঙ্গে বাবুর মেলামেশা নিয়ে কেউ মাথাও ঘামাত না। যদিও সকলে মাথা ঘামাল। সেইদিনটা এখনও ওসমানের মনে পড়ে। কিরণ পোদ্দারের বাড়ির বড় আঙিনায় দুই পাড়ার লোক দুই ধারে বসেছে। একটু বেলার রোদে একপাশে দাঁড় করানো হ্যান্ড-ট্রাকটারটা চোখ মেলে গিলছে সব। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাবু। কিনু মোল্লার প্রস্তাবে ও সকলের একমতে বাবুর দুই কানের লতিতে আঙুল ঠেকানো। কিছুটা আলগা এবং তা অপমানবশত। রূপাকে নাকি বাবু মজা করে ঘাড় ধরে ঠেলা দিয়েছে এবং তাতে রূপার চোট লেগেছে। তার চিকিৎসার জন্য এখন যথেষ্ট টাকার দরকার৷ সে ঘাড় নাড়াতে পারছে না। এইকথা বলে রূপার মা থেকে থেকেই কেঁদে উঠছে। ‘তাছাড়া এটাতো ভীষণ অন্যায়। গরিব, তারপর মেয়েমানুষের গায়ে হাত’ বুড়ো কিরণ পোদ্দারের এইকথায় মাথা নেড়ে কিনু মোল্লাও সায় দিয়েছিল। বাবু যে রূপার গায়ে হাত দিয়ে ভয়ানক গোনা করেছে তা সেও স্বীকার করে। শেষমেশ সকলের একমতে বাবুকে কান ধরে কুড়িবার ওঠবস করানো এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। জরিমানার হিসাব আরও বেশি ছিল। বুড়ো তাহের সকলের কাছে হাতজোড় করে তা তিনহাজার টাকা কমিয়েছিল। সেই বিকেলেই ওসমান তাদের খাওয়ার জন্যে যে আটবস্তা ধান তোলা ছিল, তা বিক্রি করে মাতব্বরদের হাতে তুলে দিয়েছিল। আর বাবু সেদিন শেষের দুপুরে দাওয়ায় বসে খেল বটে, কিন্তু তাকে বড়ো বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। বিকেলে সে বেড়িয়ে ফিরল তাড়াতাড়ি। তখন তার মুখ থমথমেআর সেই রাত আলো দেখার আগেই বাবু তার ঘর ছাড়লকিছুটা অপরাধবোধে মাতব্বরদের ভরিয়ে দিতেই যেন সে এই কাজ করেছিল বলে ওসমানের মনে হয়। তারপর থেকে আর তার হদিস পাওয়া যায়নি। ছোটভাইয়ের ফিরে আসার কথা ওসমান আর ভাবেও না। ঘরটা সে অনেকবার ভেঙে ফেলতে চেয়েছে। ওটা কেমন যেন পোড়া ঘাঁ-র মতো দেখায়। কিন্তু আম্মু ভাঙতে দেয়নি। মাঝেমধ্যে তার মনে হয় তাদের সংসারটা কেমন যেন ভেঙে গেছে। যেন সব ধান ঝরে গিয়ে শুকনো গাছটা পড়ে আছে। ধানের মতো যা দেখতে লাগে তা আসলে চিটে, মরা খোসা। খুঁটলে চাল পাওয়া যায় না। আম্মু, তালেব সকলে যেন এইরকম চিটের মতোই হয়ে গেছে। শেষ বয়সে দড়ির মতো শুকিয়ে যাওয়া আব্বাও এইরকম হয়ে গেছিল। আর শৌখিন বাবুও কি সেই রাত থেকে চিটের মতো হয়ে গেছেআর ওসমান কেবল সেইসব চিটের মধ্যে চাল খুঁজে বেড়াচ্ছে। 

ভাবতে-ভাবতে ওসমানের ঝিম আসে। গাঢ় হওয়ার আগেই তা কেটে যায়। তার চোখের সামনে কেবল এক উঠোন ছড়ানো ধানের ছবি ভেসে ওঠে। সদ্য লেপা উঠোন ধানে ভরে গেছে। বাদলি একপাশে বসে সতর্ক চোখে তাকিয়ে আছে আর মাঝেমধ্যে কোনও পাখি ঠোঁটে একটা ধান তুলতে ঝুঁকলেই চেঁচিয়ে উঠছে ‘হুট’আর মাত্র কয়েকদিন। অত ধানের মাঝে তখন চিটের আর জায়গা কোথায়! আব্বার বানানো ধান ঝাড়ার মড়াইটা তখন ফুরসতই পাচ্ছে না। উঠোনময় ছড়ানো ধানে পা ডুবে যাচ্ছে খেতফেরত ওসমানের। এসব ভাবতে-ভাবতে ওসমানের চোখে আধখানা আকাশ পেরিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন খেলা করে। এবারের ফসল বেচে ওসমান আবার তার সংসারটা সাজিয়ে তুলবে। বড় ভাই তালেবকে সে একটা সাদা পাঞ্জাবি কিনে দেবে। ঠিক কুতুবের মতো। সাথে একটা সাদা টুপি। একটা বিবি, এক উঠোন ধান, নতুন একটা শামিয়ানার স্বপ্নে ওসমান পরম মমতায় আকাশের দিক তাকায়।                                   

হাওয়া বইছে। তীব্র হাওয়ায় পুরো পাড়াটা যেন শুয়ে পড়ছেঝড়ের শব্দে জেগে উঠে প্রথমে ওসমান কিছুক্ষণ সাড় পায় না। ঘরে বসেই সে পাশের ঘরে আম্মুর চিৎকার শোনে। বেভুল হয়ে ওসমান অন্ধকারে বসে থাকে কিচ্ছুক্ষণ। দাওয়ায় এসে দেখে উঠোনের আমগাছ দুটো ঝড়ে বেসামাল হয়ে দুলছে। যেন যেকোনও সময়ে তারা মাটি ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। গোয়ালের পিছনে থাকা জামগাছের একটা ডাল ভেঙে পড়ার শব্দে ওসমান সেদিকে ঘুরে তাকায়। কিছু একটা বলতে-বলতে কুপি হাতে করে আম্মু বেরিয়ে আসে। যদিও আম্মুর কথা হাওয়ার শব্দে ওসমান শুনতে পায় না। বরং হাতের কুপিটা হাওয়ার তোড়ে নিভে গিয়ে পুনরায় অন্ধকারটা ফিরে আসে। হাওয়ার শব্দকে মাঝেমধ্যে থামিয়ে দিয়ে আকাশের মেঘ ডেকে উঠছে। ওসমান সেদিকে বেবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। হাওয়া, মেঘের ডাক সবকিছু তার সমস্ত সারকে ফাঁকা করে দিয়েছে। রাতের অন্ধকারকে আরও জমাট করে দিয়েছে ঝড়ের মেঘ। মেঘ দেখে ওসমানের বুক কেঁপে যায়। এমন ঝড়ে পুরো খেত বসে যাবে। অর্ধেকের উপর ধান ঝরে যাবে মাটিতেই। যা থাকবে, তা বিক্রি করলেও ওসমানকে তিনটে পেট চালানোর জন্য চাল সেই কিনেই খেতে হবে। ঝড় বিদ্যুৎ অন্ধকারে থই না পেয়ে ওসমান দাওয়া থেকে উঠোনে নেমে আসে। তার মাথা ক্রমশ চিন্তায় পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠছে। তার জমিটাই সবচাইতে আগে পড়ে৷ ঝড়ের সামনে সবার আগে তার খেতই পড়বে। বাকিদের কারও কারও জমির আশেপাশে গাছপালা, ঘর আছে বলে কিছুটা হাওয়া আটকাবে। তার জমির সামনে কেবল একটা ন্যাড়া বাবলাগাছ দাঁড়িয়ে থাকে। পথে উঠে এগোতে গিয়ে ওসমান বারবার ধাক্কা খায়৷ প্রবল হাওয়ায় সে ঠিক করে চলতে পারে না। জমির দিকে যেতে গিয়ে ওসমানের পা দুটো বারবার বেসামাল হয়ে যায়। তার মতো পুরো পাড়াটাও যেন হাওয়ায় দুলছে। আকবর চাচার উঠোনের লম্বু গাছগুলোর দোলা দেখে ওসমান ভয় পায়। এই ঝড়ে একটা ধানগাছও দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। চলতে-চলতে ওসমান থামে। আকাশে ঘন কালো মেঘ। এরপর বৃষ্টি নামলে আর কিছুই থাকবে না। ধান তখন কাদায় গেঁথে যাবে। কাছাকাছি কোথাও একটা বাজ পড়তেই ওসমান আবার চলা শুরু করে। সজনে গাছের গাঁ ঘেঁষে বরকত ফকিরের যে চালাটা ছিল সেটা একটা ডালসমেত মাটিতে লেপ্টে আছে। ফকিরের পোষা মাদী ছাগলটাকে ভয়ে ছুটোছুটি করতে দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুতের ফলায় এঁকেবেঁকে চলা ওসমানকে এখন বুড়ো ভিখিরির মতো দেখাচ্ছে। সে দেখল নাজুদের একটা খুঁটি ধ্বসে গিয়ে পুরো ঘরটা চালসমেত বসে গেছে। ঝড়ের সঙ্গে মেঘের ডাক পুরো পাড়াটাকে যেন চিরে ফেলছে। ওসমানের জমির সামনে আবছা অন্ধকারে গোটা মুসলমান পাড়াটা স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে। থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকা এক-একজনকে দেখে ওসমানের মনে হচ্ছে ন্যাড়া বাবলাগাছের মতো। কোনো নড়াচড়া নেই। পাতা ঝরে যাওয়া বাবলাগাছের মতো প্রতিরোধহীন। মকসুদ ওসমানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বললআরো দুই-একজনও ওসমানের দিক তাকিয়ে থাকে। একপাশে দাঁড়ানো কুতুবের দীর্ঘ শরীরটা একটু যেন ঝুঁকে গেছে। যদিও তার মাথা আকাশের দিকে উঁচু। ঝড়ের থেকে ফসল বাঁচাতে কুতুব একমনে দোয়া দরুদ পড়ছে। এই দুর্যোগের রাতেও সে তার পোশাককে ভোলেনি। তার দোয়া দরুদ পড়া ভারী স্বর ঝড়ের শব্দে অন্যদের কানে পৌঁছায় না। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। পবিত্র আলো একটু পরেই বেরিয়ে আসবে। সেই আশায় কুতুব একমনে প্রার্থনা করে চলেছে। তার দোয়াদরুদ পড়ার মাঝেই দূরের শোভাফুল গাছটা উপড়ে যায়। কুতুবের শরীর প্রার্থনায় আরো বেশি করে শক্ত হয়ে ওঠে৷ ইশারায় সে বাকিদেরও তার সঙ্গে যোগ দিতে বলে। কিন্তু বেভুল ওসমানদের কারো মাথা আকাশের দিকে ওঠে না। বরং তারা দেখে আকাশ থেকে বড় বড় ফোঁটায় শেষ আঘাতের মতো বৃষ্টি নেমে আসছে। হতাশ ওসমান মাটিতে বসে পড়ে। তার দেখাদেখি বাকিরাও। একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা কুতুবের দোয়াদরুদ পড়া থেমে যায়। বৃষ্টির জলে ভিজতে থাকা মানুষগুলো কোনো সাড় পায় না। বরং মরা টিকটিকির মতো চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে খেতের দিক। হাওয়ার তোড় যত কমে বৃষ্টির বেগ তত বাড়ে। ন্যাড়া বাবলাগাছটার নীচে বসে ওসমান আকাশের দিকে তাকায়। তার চোখ এখন কুতুবের বলা পবিত্র আলোটাকে খুঁজে অথবা সেই সাদা বকটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেবদলে তালেবের অন্ধ চোখদুটো ওসমানের সামনে ভাসতে থাকে। অল্প হাওয়ায় বাবলাগাছের একটা ডাল ওসমানের মাথার উপর দুলতে থাকে বাদুড়ের মতোফাঁকা বুক নিয়ে ওসমান ধীরে-ধীরে জমিতে নেমে আসে। তার খালি পা নরম কাঁদায় ডেবে যায়। শুয়ে পড়া ধানগাছের দেহগুলো ওসমানের পায়ে লাগেবাবুর ঘরটাও নিশ্চয়ই আম্মুর চোখের সামনে এতক্ষণে ভেঙে পড়েছে। এক আকাশ মেঘের নীচে দাঁড়িয়ে ধানগাছগুলোকে দেখতে-দেখতে তার ভেজা গাল বেয়ে জলের ধারা নেমে আসেঝাপসা চোখে ওসমান দেখে পটল খেতের মধ্যে ধীরেসুস্থে শরীর লুকিয়ে ফেলছে একটা সাপ। 

            

শিল্পী: চন্দন মিশ্র

                                                                                                                                   

 

 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কথাসাহিত্যিক নলিনী বেরার সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন অন্তরা চৌধুরী

  প্রত্যেকটা উপন্যাসই আত্মজৈবনিক :   নলিনী বেরা                    ( নলিনী বেরার সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন অন্তরা চৌধুরী) বাংলা কথাসাহিত্যে নলিনী...