আতশবাজির মেয়ে
অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়
আতশবাজি তৈরিতে হাতযশ
আছে নূরজাহানের। এই শাহপুর, আশেপাশের আরও দু-দশটা গ্রাম; এমনকি গঞ্জ-মফস্সলের বড় বড়
শহরের বাজারেও পড়তে পায় না তার তৈরি বাজি। নিমেষে ফাঁকা হয়ে গিয়ে ট্যাঁক ভরে ওঠে
পসরাদারদের। তার বিশেষত্ব হল—
তুবড়ি, রংমশাল, হাউকেটে আর চকোলেট বোম।
সেসব
হল গিয়ে দেখবার মতো জিনিস। আলোর ঢেউয়ে, রঙের ফুলকিতে, শব্দের গর্জনে— অবাক করা কাণ্ড একেবারে!
পুরো শাহপুর
গ্রামেতেই তার খাতির একটু বেশিই এজন্য। ছেলে-বুড়ো-মেয়ে নির্বিশেষে সব্বাই তারিফের
চোখে দেখে তাকে; তার হাতের কাজকে। সমঝদার ব্যাপারীও মুগ্ধ তার ক্রিয়াকৌশলে। দূর দূর
থেকে অনেক পাইকার এসে কিনে নিয়ে যায় তার তৈরি আতশবাজি।
সম্বৎসরই চাহিদা
রয়েছে তার কাজের; আর বিয়ে শাদি-পরবের মরশুম অথবা দীপাবলির আগে লোকে হত্যে দিয়ে পড়ে
থাকে তার কাছে। যোগান দিয়ে দিয়ে কূল পায় না নূরজাহান।
তবু সে হেল্পার রাখেনি
কোনও, কাউকে শেখায় না তার নিজস্ব বিদ্যে; একার হাতেই যতটা পারে সামলে নেয় সব। মাঝে
মাঝে গফুর, তার মিয়া, হাতে হাতে এগিয়ে দেয় এটা-ওটা ব্যস, এইটুকুই। তাও কালেভদ্রে।
আসলে টিকিই পাওয়া যায়
না গফুরের। ঘরে খুব কম সময় থাকে সে। খেতমালিকদের থেকে সবজি-আনাজ কিনে ভিনগাঁয়ে
হাটে হাটে সওদা করে ফেরে গফুর। আদ্ধেক রাত বাড়িই আসে না সে। কোন কোন গাঁয়ে-গাঞ্জে
রাত কাটিয়ে দেয় অন্যান্য ব্যাপারীদের সঙ্গে।
টো টো করে ঘুরে
বেড়ায়। ছিলিম নেয়। মনে বড় দুঃখু তার। পাঁচ সাল হয়ে গেল শাদির, এখনও কোনও বাচ্চা
আসেনি নূরজাহানের কোলে। বে-অওলাদ হয়ে আছে সে। তবে এজন্য নূরীকে কখনও কটু কথা বা
কুবাক্য বলেনি কোনওদিন।
সবই নসিব। ভাগ্য। কিসমৎ।
চেষ্টার তো কিছু বাকি রাখেনি তারা। জহির হাকিমের অব্যর্থ দাওয়াইয়েও ফল হয়নি কোনও।
পঁচিশ মাইল তফাতে গোবিন্দপুরের জাগ্রত শ্মশানকালীর মন্দির থেকে মায়ের পায়ের ফুল
নিয়ে মাথায় ছুঁইয়েছে। চন্নামেত্তর খাইয়েছে। কিস্যু কাজ হয়নি। যে কে সে-ই।
তবে আশা ধুকধুক করছে
এখনও। তাদের গাঁয়ের বুড়ো রহমত আলি খুব বড় গনৎকার। সব সময়ে দশ-বিশটা লোক পড়ে আছে
তার ডেরায়। সেই রহমত চাচা নূরজাহানের হাত খুঁটিয়ে দেখে, বিস্তর মাথা খাটিয়ে
গুনে-গেঁথে বলেদিয়েছেন, “কিচ্ছু চিন্তা করিস না বেটি, খুব লক্ষ্মীমেয়ে তুই, গফুরের
নসিব অনেক ভাল যে তোর মতো বিবি পেয়েছে... এই ইদের পরেই মা হবি তুই, কোলজোড়া আলো
করে নূরের মতোই ছেলে আসবে তোর, শুধু নিয়ম করে নামাজ পড়ে যা, রমজান মাসে রোজা রাখবি
তাহলেই... আর এই মাদুলিটা... নূরীর কোমরে বেঁধে রাখার জন্য একটা মাদুলি দিয়েছেন
তিনি।
সেই থেকে আশায় রয়েছে
ওরা। মাদুলিটা একবার কোমর থেকে খোলেনি নূরি। গফুরও আশায় আশায় বড় মসজিদে গিয়ে মানত
করেছে চুপিচুপি। ছেলে হলেই জোড়া পাঁঠা দেবে বকরি ইদে।
তা রমজান শুরু হতে
এখনও দেরি আছে মাসখানেক। মসজিদের পিছনের বেগুনখেতের দিকে একঠায় তাকিয়ে থাকে গফুর।
বিকেল মরে আসছে। ওদিক ধুধু বেগুনখেতের ওপারে বাঁশবন। তারপরে গ্রাম। ঘন বাঁশঝাড়ের
ফাঁকফোঁকরে যেন অস্পষ্ট টেমির আলো নড়ে ওঠে।
রোজকার কাজকর্মে,
ব্যস্ততার ফাঁকে আজকাল মাঝেমাঝেই আনমনা হয়ে যায় নূরি। ডাঁই করে রাখা মাটির খোলে
বারুদ ঠাসতে-ঠাসতে কখনও-সখনও নিজের অজান্তেই হাত চলে যায় পেটের নীচে। শাড়ির তলায়
চর্বির ভেতরে কিছু একটা নড়াচরা করছে না? খুব ক্ষীণ একটা প্রাণের স্পন্দন যেন অনুভব
করছে সে। গা-টা একটু গুলিয়ে উঠল কি? বমি হবে বোধ হয়! মাথা ঝিমঝিম করছে না!
হাতের পাতা মেলে
অপলকে চেয়ে দেখে সে। কালিমাখা ঝাপসা কতকগুলো আঁকাবাঁকা রেখা। তার এই কালিমাখা
ভাঙাচোরা রেখার ভাঁজেই লুকিয়ে আছে সেই খুশির টুকরো। ঠিক যেভাবে কয়লার ভিতরে ঘাপটি
মেরে বসে থাকে অজানা হীরকখণ্ড।
রহমত চাচা বলেছেন। এই
ইদেই। একটা শিরশিরে পুলক-তরঙ্গ উঠে আসে শরীরের অন্ধকার থেকে।
মনে মনে সে দোয়া
জানায় আল্লাহর কাছে। সব যেন ঠিক করে দেন তিলি। হাতের খোলটা এক পাশে তাগাড় করা তুবড়ির
স্তূপে ঠেলে দিয়ে একবার আকাশের দিকে চাইল সে। উঠোনে ঠান্ডা হাওয়া চলছে অল্প অল্প।
মশলার বস্তাটা তুলে ঘরে ঢোকাতে হবে। রেডি হয়ে যাওয়া মালগুলোও।
উপরে আকাশের রেখায় মেঘের
কালিঝুলি। বৃষ্টি নামবে বোধ হয়। গফুর মিয়া খেতে এল না এখনও।
—নূরি।
অবেলায় ঘুমোলি নাকি! এই নূরি!
চমকে উঠে চটকা ভেঙে
গেল নূরজাহানের। মাথার পিছনটা অল্প ঠুকে গেল চৌকিতে। ভুরুদুটো কুঁচকে চোখ চাইল সে।
সামনে গফুর। উল্লসিত মুখ।
—অবেলায়
বসে বসে ঘুমোচ্ছিস কেন?... কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেল নূরজাহান। চোখ দুটো
কচলে নিয়ে ঢাকনা সরাতে সরাতে বলল, ‘খেতে বসো। আমিও খাইনি।’
চৌকিতে মাথা হেলিয়ে
চুপচাপ বসেছিল সে। চোখ লেগে গিয়েছে কখন। তার কথার উত্তরে রীতিমতো উত্তেজিত স্বরে
গফুর বলল, ‘রাখ তোর খাওয়া। খোদার দোয়ার একটা দারুণ কাজ পাওয়া গেছে। রাতারাতি বড়লোক
হয়ে যাব আমরা।’ বলে, সে খুশিতে নূরির হাতদুটো মুঠোয় নিয়ে নিজের বুকে চেপে বলল,
‘সোনা বিবি আমার...। দারুণ কাজ... সব তোর এই হাতদুটোর ওপর নির্ভর করছে... ওহ, বিবিজান
কী আনন্দই যে হচ্ছে আমার কী বলব... খাওয়া পরে... আগে সব খুলে বলি শোন...।’ গলা খাদে
নামিয়ে ফেলল সে...।
নূরজাহান ভীত হল। সন্ত্রস্তও।
কিন্তু সেটা প্রকাশ না-করে চোখদুটোয় বিরক্তি মাখিয়ে নীরব চাউনি পাঠাল গফুরের চোখে।
চোখ চকচক করছে গফুরের। মুখে চাপা হাসি। কথা বলতে গিয়ে যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল চোখের
মণি, “এই একটু আগে দর্জিপাড়ার ভেতর দিয়ে আসছি... ওদিকে একটা খাল আছে জানিস তো...
তারপর পরপর বেলগাছ... জায়গাটা তো সবসময়েই ফাঁকাই থাকে...” স্থিরভাবে চেয়ে আছে
নূরজাহান, একচুলও মাথা হেলল না তার... সেদিকে খেয়াল না-করে গফুর উৎসাহভরে বলে যেতে
লাগল, “যেই না বেলতলার কাছে এসেছি, অমনি কে যেন হেঁড়েগলায় নাম ধরে ডাকল... আমি
ফিরে তাকিয়েই দেখি বেলগাছগুলোর আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে তিনটে লোক... একজনের
মাথা-মুখ গামছা দিয়ে ঢাকা... আমার তো বুক গুড়গুড় করে উঠছে...’ একটুও না-থেমে বলে
যাচ্ছে গফুর, “কাছে এগিয়ে এসে লোকটা মুখের থেকে গামছা সরাতেই দেখি আব্বাস! আব্বাস
কে বুঝলি তো? আরে করিমপুরের পান্তা আব্বাস আলি...! আমার তো পা কাঁপছে থরথর করে...
মনে হচ্ছে মরেই যাব এবার... তো আব্বাস কিন্তু একগাল হেসে বুকে জড়িয়ে ধরল আমায়...
‘খুদা হাফিজ’ও বলল... একেবারে ঠান্ডা শান্ত গলায়... নূরজাহানের সমস্ত শরীরটাই জমে
যাচ্ছে... একেবারে জমাট, পাথর... চেষ্টা করেও একটুও নড়তে পারছে না সে... নিশ্বাস
বন্ধ হয়ে আসছে... ফ্যাঁসফ্যাঁসে ধরা গলায় কোনওক্রমে বলল, ‘আব্বাস আলি মানে
করিমপুরের গুন্ডা আব্বাস... যার দল মস্তানি করে বেড়ায়... লুঠপাট, ছিনতাই করে...
সে?’
কোনও উত্তর দিল না
গফুর। সামান্য চুপ করে গলা আরও নামিয়ে নিয়ে বলল, ‘শোন না আগে...। তারপর আমাকে খুব
খাতির-টাতির করে বেলতলায় বসাল, বিড়ি খাওয়াল... এই দ্যাখ কী দিয়েছে।’ কোমরের কাছে
লুঙির গেঁজে থেকে বের করে সে দেখাল... একটা কালো রঙের ছোট মোবাইল ফোন... আবার
ঝিকমিক করে উঠল চোখদুটো। বলতে লাগল, ‘ওরা একটা প্রস্তাব দিল আমায়... সোজাসুজি
ব্যবসার প্রস্তাব... এই হাতে দাও, ওই হাতে নাও। বুঝলি... এক-একটা পাঁচশো টাকা...’
শূন্যে মুঠো ঘুরিয়ে দেখাল সে... নূরজাহান সম্পূর্ণ প্রস্তরীভূত হয়ে গেছে... সিলুয়েট
মূর্তি, নিঃস্পন্দ... নিথর... গফুর বলে যায়, ‘তোকে শুধু বোমা তৈরি করে বাঁধতে
হবে... ব্যস... তারপর সব আমার দায়িত্ব... তোর কোনও কাজ নেই আর... আব্বাসের দলের
একটা ছেলে এই শাহপুরেই থাকে, কাছেই... ওকে সাপ্লাই দিয়ে টাকা নিয়ে আসব আমি
রাতেরবেলা... হাতে হাতে... কেউ জানবে না... রাতারাতি বড়লোক...’ কথা শেষ করে খ্যাঁ
খ্যাঁ করে হাসতে লাগল গফুর। নূরজাহান জমে যাচ্ছে। জমাটবাঁধা পাথরের
চাপে তার শরীরের এক-একটা অংশ গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। ঊরু-পা-হাত-বুক-কাধ-ঘাড়...
শেষ চেষ্টায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল, ‘কিছুতেই না, কিছুতেই পারব
না আমি, আর খোদার কসম তোমাকেও এই সব্বনেশে খেলায় জড়াতে দোব না আমি... কিছুতেই না...।’
হাসি বন্ধ হয়ে
গিয়েছিল গফুরের। এইবার থমথমে অথচ নিচু স্বরে স্পষ্ট করে কেটে কেটে বলল, ‘পারতেই
হবে। পেছনে ফেরার রাস্তা নেই কোনও। জবাব দিয়ে এসেছি আমি। না-রাখলে ওরা জিভ কেটে
নেবে আমার। সেই সঙ্গে তোরও। তারচে ভাল কথায় শোন, কোনও ঝুঁকি নেই এতে। ওরা রাহাজানি
করার জন্য বোমা নেবে না। ওদের দলের কয়েকটা ছেলে নিজেদের আলাদা দল বানিয়ে বেইমানি
করেছে আব্বাসের সঙ্গে। ওরাই কোনও শহর থেকে বোমা আনিয়ে চার্জ করছে। আব্বাসের কাছে
এটা ইজ্জতের লড়াই। নিজেদের বাঁচাবারও...।’ থেমে গেল গফুর।
খনখন করে উঠল
নূরজাহান, “ওগো তোমার পায়ে পড়ি গো। এই সব্বোনেশে খেলায় নেমো না... বরবাদ হয়ে
যাব... ধবংস হয়ে যাবে সব... আমার পেটে যে খোদার দান আসছে গো... শেষ হয়ে যাবে সব...’
‘চুপ কর মাগি!’
ঝাঁঝিয়ে উঠল গফুর। ক্রুর চোখে তাকাল নূরজাহালের দিকে। তারপর ঠোঁট চেপে ফিসফিসে
তোতো গলায় বলতে লাগল, ‘তুই চাস তোর ছেলে তোর মতো বাজী বানাবে? আমার মতো হাটে সবজি
বেচবে, তাই চাস?’ হাউহাউ করে নূরজাহান বলল, ‘ওগো, আমরা দুজনে মিলে যা কামাই করি
তাতে চলে যাবে গো, ছেলেকে স্কুলে রাখতে পারব আমরা।’
‘না। আমার আরও টাকা
চাই। আমার ছেলেকে জেলার বড় ইস্কুলে পড়াব। তিনটি মাস্টার রাখব বাড়িতে। খরচা নেই
তার? আরও অনেক অনেক টাকা চাই আমার!’ কথাটা শেষ করে ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বিশ্রী করে
ফ্যালফ্যাল করে হাসতে লাগল গফুর। চোখ দুটি বুজে এসেছে তার। শেষ চেষ্টায় নিজেকে
ঝাঁকিয়ে তুলল নূরজাহান।
‘পারব না! ওসব করতে
জানি না আমি। কিছুতেই পারব না!’ আবার একটা অশ্লীল হাসি দিয়ে গফুর বলল, ‘ওর একটা
স্যাঙাত শিখিয়ে দেবে আমাকে। আমি বলে দেব তোকে। তুই চুপচাপ বানিয়ে দিবি।’
‘এই সব যখন ওর লোকও
বানাতে পারে, তাহলে ওরাই বানাচ্ছে না কেন?’
‘তার উত্তর কি ওরা
আমায় দেবে? না আমি তোকে দেব?’ চোখ কটমটিয়ে বলল গফুর। পরক্ষণেই শান্ত নিশ্চল দৃষ্টি
নিয়ে মুখে হাসি টেনে বলতে লাগল, ‘ওরা না-বললেও কারণটা আমি জানি। তোর হাতের বাজির
এত নাম এদিকে... আরে বাবা... এও একটা বাজিই... মামদোবাজি।’ আবার খিকখিক করে হাসতে
লাগল গফুর। ‘সলফার লাগবে। আরও কয়েকটা জিনিস লাগবে। নিয়ে আসব। দেখিয়ে দিস তারপর তোর
হাতের কামাল... আর শোন...।’ গলাটা আরও কমিয়ে ফেলল গফুর। ‘ভয় পাবার কিছু নেই এতে। বেশিদিন
করতে হবে না একাজ। আব্বাস বলেছে অদের নিজেদের এই খেয়োখেয়ি ঠান্ডা হয়ে গেলেই বন্ধ
করে দেবে এসব। এ শুধু ইজ্জতের লড়াই।’ বলতে-বলতে গলাটা আবার চড়ায় তুলল গফুর, ‘আর
ততদিনে আমাদের হাতে মোটা টাকা এসে যাবে। এই শীতেই কপিখেত ইজারা নিয়ে নেব। ব্যস, আর
কী চাই? তোকেও আর বছর বছর বাঁধতে হবে না তুবড়ি।’ হেহেহে...’ জোর গলায় হেসে উঠল সে।
কোনও কথা বলল না
নূরজাহান। টপটপ করে গড়িয়ে পড়া চোখের জলে ভিজে উঠল তার গাল-গলা-বুক।
সন্ধের নামাজ শেষ করে
একা একাই ইফতারে বসল নূরি। একটা আপেলের টুকরো মুখে দিয়ে চিবোতে লাগল অন্যমনস্ক
ভাবে। ইদের আর সাতদিন বাকি। মাসব্যাপী কঠোর সেহরী পার করার পর সূবা এসে পৌঁছাবে
পবিত্রতার উৎসব। শরীরে-সত্তায় লাগবে ফুরফুরে সুস্থতার ছোঁয়া। সারা বিশ্বজুড়ে অধীর
আগ্রহে কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষ অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছে শেষের সেদিনের, যেদিন
সূর্যের প্রথম আলো সেই মহামানবের শ্বাশত বার্তা বয়ে আনবে। হাওয়া-বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে
সৌহার্দ। সব অন্তর শুদ্ধ ও শক্তিমান হবে চেতনার আলোকে।
কিন্তু, কই তার তো
খুশি-খুশি লাগছে না। আনন্দ হচ্ছে না এক ফোঁটাও। দূর থেকে মনে হচ্ছে সৃষ্টির প্রথম
প্রহর থেকে সে সেহরী শুরু করে দিনের শেষে পর্যন্ত ইফতার করে চলেছে। এর কোনও শেষ
নেই। প্রতিদিনই প্রথম দিন। দীর্ঘ, লম্বা, আয়তকার। প্রতিদিনই একই রকম ভারী, জমাট
ক্লান্তিকর।
তিন-চার খেপে বোমা
সাপ্লাই করে দেদার কামিয়েছে গফুর। বাড়িঘরে নতুন টিনের দরমা-রডের পোঁচ। গফুরের গলায়
পেল্লাই এক সোনার চেন নিজের অস্তিত্ব জানান দেয় সবসময়।
নূরজাহানের খুশি নেই
কোনও। গোসলঘরে দাঁড়িয়ে কখনও নিজের হাত বুলিয়ে অনুভব করতে চায় সে। কই, এক ইঞ্চিও তো
বাড়েনি তার ভ্রুণাগার। কোথাও প্রাণের চিহ্ন নেই কোথাও। স্ফীত হয়নি তার গর্ভ।
গফুরের প্রাণে অঢেল রোশনাই।
দেখে মনে হয় না পিতৃত্বের অধিকার না-পাওয়ায় তার আর কোনও খেদ-গ্লানি আছে! মনস্তাপ
সর্বদাই হইহট্টগোল করে রঙিন মেজাজে আছে সে।
চৌকির তলায় চট বিছিয়ে
বোমাও আড়াল করে ঢেকে রাখে সে। বিস্ফোরক গোলকগুলি নিশ্চেতন হয়ে ঘুমোর। অপেক্ষা করে
কোনও এক অশব্দ জাগরণের।
ঘরের ভিতরে নিরালায়
তাদের ভ্রুণ তৈরি করতে-করতে নিজেরই অশ্রুজলে ভিজে যায় নূরি।
বিস্ফোরণের ধাক্কায়
চৌকির কাঠ, দেয়াল, দরমা, টিনের চাল, ছাদ-সমেত পুরো ঘরটাই উড়ে গেছিল। একটা বীভৎস
শব্দ। আকাশ ভেঙে পড়ল যেন। গফুরের বাড়িতে আশেপাশে লোকবসতি কিছু কম। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে
কয়েকঘর মুসলমান গেরস্থ। খেটেখাওয়া মানুষ সবাই। আতঙ্কে-বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে কয়েকজন
মানুষ দৌড়াতে- দৌড়াতে এসে দেখল ঘরখানা দুমড়ে-মুচড়ে পাথরের ধ্বংসস্তূপ!
পাগলের মতো কপাল
চাপড়াতে-চাপড়াতে গফুর মিয়া সেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর বেরিয়ে আসা দু-খানা পা ধরে টেনে
বাইরে আনার চেষ্টা করছে। দৌড়ে গেল সবাই। গফুরের বাড়ির খোলা সদর দরজা দিয়ে একে একে
ভেতরে ঢুকছে আরও অনেকে।
চিৎকার করে বিলাপ
করছিল গফুর মিয়া।
দুই
দাওয়ায় বসে বসে সারাদিন ধরে ঝিমোয় গফুর।
কোমরের নীচ থেকে সবটাই শূন্য। নাওয়া-খাওয়া সবই করিয়ে দেয় নূরি। নিজের চেষ্টায় আর
কিছু করতে পারে না সে। শুধু মাঝে মাঝেই সশব্দে বুক চাপড়ায়। জড়ানো গলায় বিড়বিড় করে।
কীসব অর্থহীন প্রলাপ।
চোখের তলায়, চোয়ালের
ভাঁজে, শিরাপাকানো হাতদুটোয় বয়সের অন্ধকার। চুল-দাড়িতে থাবা ফেলেছে ধূসর সময়।
এই কবছরেই যেন একশো
বছর বয়স বেড়েছে তার।
নূরজাহান অনেকটাই
শক্তসমর্থ। যৎসামান্য কুঞ্জন আর দু-একটা পক্ককেশ ছাড়া বয়সের দস্যু ধারকাছ মাড়ায়নি
তার। সে আরও শান্ত, ধীর, অচঞ্চল। রোজ সকালে ধরে ধরে গফুরকে বাইরে উঠোনে বসিয়ে দেয়
সে। তারপর পাশে বসে বাজি বানায়— তুবড়ি, রংমশাল, রকেট। নিঃশব্দে কাজ করে যায় তার
বারুদ মাখা অভিজ্ঞ আঙুলগুলো।
সাত বছর আগের এক
রাতের বিস্ফোরণে ডান হাতের তিনটে আঙুল উড়ে গেছি তার। এখন সাতটা আঙুল দিয়েই তরতরে
নিপুণভাবে আতশবাজি তৈরি করে সে তুবড়ি, রংমশাল, হাউইবাজি। দূরদূরান্ত থেকে পাইকাররা
এসে কিনে নিয়ে যায়। নিখুঁত শিল্পকর্ম। এ তল্লাটে বাজির কারিগর হিসেবে বেশ সুনাম
আছে তার।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে
থাকে গফুর। ফ্যালফেলে, প্রশ্নহীন, কখনও বা প্রশ্নাতুর দেখা। জোরে জোরে বুক চাপড়ায়।
বিলাপ করে। ধীর পায়ে উঠে গিয়ে স্বামীর কাছে যায় নূরি। ডান হাতের দুই আঙুল দিয়ে
কমালে-মাথায় হাত বোলায়। স্নেহের স্পর্শ। বড় মায়াভরে গফুরের মুখটা চেপে ধরে নিজের
বুকে। বা-হাত দিয়ে ধীরে ধীরে চুলে বিলি কেটে দেয়।
বছর পাঁচেক আগে একটা
রোড অ্যাক্সিডেন্টে পা দুটো হারিয়েছে গফুর। শীতের সন্ধে। আধপাকা সড়ক। করিমপুর থেকে
সাইকেলে ফিরছিল সে। মাতাল ট্রাকড্রাইভার ট্রাক ফেলেই পালায়। জেলাসদর হাসপাতালে
নিয়ে গেলেও পা-দুটো বাদ না-দিয়ে উপায় ছিল না
এই পাঁচ বছরে জীবনকে
অনেক বদলাতে দেখেছে গফুর। চারপাশকে। নিজেকেও। বদলায়নি শুধু নূরি। সব কথা জানার
পরেই। নাকি বদলেছে। গফুর বোঝে না। চোখ বুঝি ঘোলাটে চিন্তার ভিতরে হারিয়ে যায়।
বিড়বিড় করে কিছু বলে ওঠে।
তার বুকের বাঁদিকে
গভীরে একটা বোমার পলতেয় আগুন ধরে আছে। কখন চড়চড় করে বাড়তে থাকে আগুনটা। পুড়ে যায়
ভিতরে। সে প্রতীক্ষা করে ফেটে যাওয়া সশব্দ বিস্ফোরণের। আগুনটা থেকে যায়। কমে আসে।
ধুঁকে ধুঁকে জ্বলতে থাকে। নিঃশ্বাসের হাপর টানে গফুর। আবার অপেক্ষা করে। বিস্ফোরণের।
সব, সবকিছু বলে
দিয়েছিল সে নূরিকে। সমস্ত। জানত সব শুনে তাকে ছেড়ে চলে যাবে নূরি। তবু নূরজাহান
যায়নি। পলতেয় আগুন ধরেছে গফুর।
হ্যাঁ, সেই তো আগুন
দিয়েছিল। আজ থেকে সাত বছর আগে সেই রাতে। বোমায় আগুন দিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে
ছিল সে। মেরে ফেলতে চেয়েছি নূরিকে।
বাঁজা মেয়েমানুষ।
বেকার চিজ। খাইয়ে-পরিয়ে বাঁজা গরু রাখার মানে হয় না। হয়তো ভাবতে পারেনি নূরি বেঁচে
যাবে। প্রায় অক্ষত অবস্থায়। কেউ তাকে সন্দেহও করে না। পাড়া-প্রতিবেশি কেউ না।
গুন্ডার দল এসে বোমা মেরে গেছে ধরে নিয়েছে সবাই। বাজিতে অমন হাতযশ যে মেয়ের, তার
তো শত্রু হবেই। আর এসব অঞ্চলে গুন্ডার বোমাবাজি জলভাত।
সব বলে দিয়েছে নূরিকে।
কমিরপুরের ফতেমার কথাও। লুকিয়ে-চুরিয়ে নিকা সেরেছিল সে। অনাবাদি খেত তো ফসল দেবে
না তাকে। ফতেমা দিয়েছিল। ছেলের নাম নিজে দিল গফুর। তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে। হুজুর।
মাঝেমাঝেই করিমপুরের
সংসারে চুপিসাড়ে গিয়ে থেকে আসত সে। কাকপক্ষীও টের পায়নি কোনওদিন। ভেবেছিল, নূরি
মরলেই ফতেমা আর ছেলেকে এনে তুলছে এই ঘরে।
হায় আল্লাহ! সেই
বিস্ফোরণের পরপরই ছেলে নিয়ে এক পাঞ্জাবি লরিড্রাইভারের সঙ্গে ভেগে গেল ফতেমা। অনেকদিন
ধরেই নাকি লটঘট চলছিল তলায় তলায়। টের পায়নি সে।
এর দুবছর পরেই তো সেই
দুর্ঘটনা। সব কিছু জেনেও কোনও প্রতিক্রিয়া হয়নি নূরের। চুপচাপ উঠে ঘরের কাজকর্ম সারল। তারপর বসে গেল বাজি বানাতে।
ঝিমন্ত দুপুরে ঘোলাটে
স্নায়ু নিয়ে ঢুলতে ঢুলতে গফুর ভাবে, গুনাহ কবুল করো তো আল্লাহ মিয়া গোস্তাফি মাফ
করেন। সে তো কবুল করেছে সবই। তবে? পরক্ষণেই ঘোর কেটে যায়। মাথা ঝাঁকিয়ে চোখদুটো
টানটান করে দূরে বসা নূরজাহানের দিকে চেয়ে দেখে সে। একমনে তুবড়ি গাঁথছে। হ্যাঁ,
আল্লামিয়া আছেন, আর সেজন্য তো সবজেনেও নূরি এখনও তার কাছে। ছেড়ে যায়নি তাকে।
কিন্তু ও সবসময় চুপ থাকে কেন? কথা বলে না কেন? দুটো গালিও তো দিতে পারে গফুরকে।
কই, কিছু বলে না তো?
একঝলক স্বস্তির হাওয়ায়
নিভু নিভু বোমার পলতেটা আবার জ্বলে ওঠে। দপ করে গফুর বুক চাপড়ায়। কাঁদে। হায় আল্লাহ!
বুড়ো রহমত আলির কাছে
দূর দূর গাঁ-গঞ্জ থেক হাত দেখাতে আসে মানুষ। খুব নাম হয়েছে রহমতের। দূর থেকে আসা
সেইসব প্রার্থীরা গফুরের বাড়ি সামনে দিয়ে যায়। চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে তাদের গালপাড়ে
গফুর। নূরি এসে মুখে হাত চেপে চুপ করায়।
ওই তো, সন্ধের নামাজ
শেষ করে উঠে দাঁড়াল নূরি। আজই শেষ ইফতার। কাল খুশির ইদ। একটা বাটিতে কিছু ফল আর
ভাজা নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসা ইফতার সারবে স্বামির সঙ্গে।
হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল।
আঙুলকাটা হাতের দুটো আঙুলে একটুকরো ফল আঁকড়ে বাড়িয়ে ধরল গফুরের মুখে। মুখ সরিয়ে
নিল গফুর।
আবার হাতটা এগিয়ে ধরে
নূরি। গফুর মুখ ঘোরায়। হাতটা এগিয়ে আনে নূরি। গফুর মুখ সরায়। শান্ত, ধৈর্যশীল
ভঙ্গিতে ফলের টুকরোটা এগিয়ে ধরে গফুরের মুখের সামনে।
| চন্দন মিশ্র |
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন