শনিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২২

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন অন্তরা চৌধুরী

লেখার সঙ্গে পরিচয় অনেকদিনের। নানা লেখায় উঠে এসেছে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। কিন্তু তারপরেও তাঁর লেখাকে নিয়ে থেকে যায় অনেক প্রশ্ন। যাঁদের নিয়ে গবেষণা, তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎটাও জরুরি। কিন্তু তখন পুজোর লেখার মরসুম। লেখকদের ব্যস্ত সময়। তাই অনেক লম্বা অপেক্ষা। তারপর লেখকের সময় নিয়ে একদিন পৌঁছে গেলাম বরানগরে, তাঁর বাড়িতে। দিনটা ছিল ১৪-০৯-১৭। সময় দিয়েছিলেন সকাল দশটায়। সবমিলিয়ে অন্তত তিন ঘণ্টা তাঁর লেখালেখি নিয়ে নানা আলোচনা। তার অনেকটাই গল্পের বিশ্লেষণের সময় বিভিন্ন জায়গায় ধরা আছে। তারই কিছুটা নির্যাস তুলে ধরা হল।

 

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় (ছবি ঋণ: গুগল ইমেজেস)  

প্রশ্ন:‌ আপনার আগেও অনেকেই তাঁদের মতো করে হাসির লেখা লিখেছেন। সেই হাসির লেখার ধারা ও বিবর্তনকে কী চোখে দেখেন?‌

 

উত্তর:‌ হাসি মানে একটা ভাঁড়ামো। যেমন, গোপাল ভাঁড়। মোটা দাগের রসিকতা। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে গোপাল ভাঁড়ের রসিকতার ক্ষেত্র শ্লীলতার গণ্ডি অনেকসময় অতিক্রম করেছে। কারণ, তখন বিলিতি বইপত্রের থেকেও বেশি ছিল কথক। যেমন হাটতলা, চণ্ডীতলা। সেখানে এসে বসতেন দাদাঠাকুর। তিনি নানা রকম মজার কথা বলতেন। সেখানে স্থূল রসিকতাও হত। ভাষায় শালীনতার অভাব ছিল। যেসব শব্দকে আমরা বলি সাহিত্যের ভাষা নয়, সেসব ভাষাও তাঁরা ব্যবহার করতেন। ব্যাপারটা মানুষ উপভোগ করত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সমাজকে কোনও বার্তা দিতে হবে। সেই সময়ের হাসির লেখা বুঝতে হলে, সবার আগে সময়টাকেও বুঝতে হবে। তখন যে আমাদের স্বাধীন হতে হবে, এই বোধটাই ছিল না। ইংরেজ আমাদের এমনভাবে দাস করেছিল যে, স্বামীজি বলেছিলেন, ‘‌হাড়েমজ্জায় দাসত্ব‌। দাস হতেই আমরা ভালবাসি।’‌

        এরপর বাল্যবিধবা, কৌলিন্য প্রথা বাংলা সাহিত্য থেকে সরে আসছে। রামমোহন রায় কুসংস্কারকে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রাকচার দিতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁর টার্গেট ছিল সতীদাহ প্রথা। নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের সময় বেরিয়ে এলেন দীনবন্ধু মিত্র। তিনি লিখলেন নীলদর্পণদেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মসমাজ ও রাধাকান্ত দেববর্মনের হিন্দুসমাজ মুখোমুখি। এর মাঝখানে ডিরোজিয়ানরা রইলেন। ডিরোজিওর মৃত্যুর পরে রামতনু লাহিড়ি ও দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার। এখানে রয়েছেন ত্রৈলোক্যনাথ ও কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁদের মূল উদ্দেশ্য স্যাটায়ার। আমাদের সাহেবপ্রীতি, সাহেবিয়ানা এটাই তাঁদের লেখার মূল বৈশিষ্ট্য, যা পরবর্তীকালে প্রেমেন্দ্র মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মধ্যেও ছিল। গুল মারা গপ্প। এঁদের জনক ত্রৈলোক্যনাথ। কিন্তু ফাদার অফ লিটারেচার বঙ্কিমচন্দ্র। যাঁর মধ্যে ছিল উইট এবং হিউমার। গিরিশচন্দ্র, অমৃতলালের নাটক এবং মাইকেলও রয়েছেন। তিনি আবার আমাদের পৌরাণিক বিষয়গুলিতে নতুন আঙ্গিকে দেখেছেন। যেমন রাবণকে অন্য আলোকে দেখেছেন। এটাই পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে একটা ইন্টালেকচুয়াল ফ্যাক্টর হয়ে প্রবেশ করছে।

প্রশ্ন:‌ তারপরই কি শিবরাম চক্রবর্তীর প্রবেশ?

উত্তর:‌ শিবরামবাবুর সময় হল স্বাধীনতার একটু আগে এবং স্বাধীনতার পর। শিবরামের কোনও লেখায় জাতীয়তাবোধ বা সমাজ সংস্কার এসব নেই। কিন্তু তিনি নিজে পলিটিক্যাল ফিগার। ছোটদের আনন্দ দেওয়ার জন্য তিনি লিখেছেন। ছোটদের লেখা আসলে বড়দেরই লেখা।

        আমি যখন লেখার জগতে ঢুকলাম, আমার সাহিত্যের ফাদার বা মেন্টর শ্রদ্ধেয় বিমল কর মহাশয়। তিনি বলেছিলেন— ‘‌দেখো সঞ্জীব, লেখা হাসিরও হয় না। কান্নারও হয় না। লেখাটা লেখাই।’‌ তুমি যদি হাসির লেখা লিখতে যাও, তাহলে হাসিরও হবে না, কান্নারও হবে না। আবার যদি কান্নার লেখা লিখতে যাও, তাহলে একফোঁটাও কেউ কাঁদবে না। তাহলে কি হাসির লেখার সঙ্গে ভাবের জগতের কোনও মিল আছে?‌ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে, কলার খোসায় পা লেগে কেউ পড়ে গেলে, আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম। এটা মোটা দাগের হাসি। এটা বাইরের ঘরের হাসি। কিন্তু ভেতরের ঘরের যে হাসি, তাকে শরৎবাবু বলছেন, There is a philosophy.‌ এবং সেটা খুব সাঙ্ঘাতিক জিনিস। শরৎবাবু বলেছেন, যে লেখায় ফিলোজফি নেই, যে লেখা আমাকে ভাবায় না, সে লেখা লেখাই নয়। দাদা ঠাকুরের সোশ্যাল স্যাটায়ার, শিবরামবাবুর শব্দ নিয়ে খেলা করা। pun‌ আমরা সংস্কৃত থেকে পেয়েছি। একই শব্দতার বিকৃত ও অবিকৃত রূপ। শিবরামবাবুর এই pun‌ning‌ ইংরাজি থেকে আগত। হিমানীশবাবু ইংল্যান্ডে থাকায় তিনিও punn‌ing করতেন। শিবরাম, তারাপদ, হিমানীশ এক গোত্রের। এঁদের প্রকৃত পিতা কে?‌ বঙ্কিমচন্দ্র। মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত–‌এ এইধরনের শব্দ নিয়ে খেলা আছে। আরেকজন খুব বড় সাহিত্যিক স্বামী বিবেকানন্দ। পরশুরামের ইন্টালেকচুয়াল হিউমার। এছাড়াও রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। এরপর উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার রায় এবং সত্যজিৎ রায়ের একটা ধারা। এঁরা আবার ব্রাহ্ম থেকে বেরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। আবার দীপ্তেন্দ্রকুমার সান্যাল আরও সাঙ্ঘাতিক। Hitting bellow the belt‌. দীপ্তেন বা সজনীকান্ত দাস কিন্তু জনপ্রিয় হলেন না। কারণ, তাঁরা পারসোনাল অ্যাটাক করলেন। এজন্য বিমল কর বলতেন, হিউমার নিজেকে করতে হয়। অন্যকে নয়।

 

প্রশ্ন:‌ এইসব লেখার কতটা প্রভাব আপনার ওপর পড়েছিল?‌  

উত্তর:‌ এবার আসি আমার কথায়। কেন আমি এই পথে এলাম। আমি সরকারি চাকরি করতাম। মধ্যবিত্ত। আমি মেড ইন ইংল্যান্ড। ব্রিটিশ পিরিয়ড। আমি যে সময়ে জন্মেছি, ১৯৩৪। তখন ব্রিটিশদের অধীনে এই দেশ। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ার শেষ হয়েছে। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার শুরু হবে। এই সময় আমি দেখছি, আমার পরিবারে ভয়ঙ্করভাবে ইংলিশ ডিসিপ্লিন। বাবা, ঠাকুরদা জ্যাঠামশাই এঁরা ইংরাজি কবিদের কথা বলেন। ব্রাউনিং, মিলটন, শেক্সপিয়র। এমনকি সেখানে রবীন্দ্রনাথও সেভাবে পাত্তা পাচ্ছেন না। তারপরই দেখতে পাচ্ছি ইংলিশ ক্যারেক্টার। স্ট্রেট হাঁটো। কারণ, আমার বাবা আমাকে শেখাতেন, হাঁটার সময় তোমার হাঁটু ভাঙবে না। স্ট্রেট হাঁটো। একটা ছেলে তার অভিভাবকদের কাছে এই সব শুনে বড় হচ্ছে। এর মধ্যে একটা স্বদেশী ব্যাপারও আছে। স্বামীজি আছেন, কিন্তু সেটা হেলথে। এছাড়া আছে ইন্ডিপেন্ডেন্সি। পারিবারিক ব্যাপারে নিজের ওপর আস্থা রাখতে পারো। নিজের কাজ নিজে করো। এবং আরেকটি জিনিস হল ক্যারেক্টার, ওটাকে হারিও না। কাজেই, এমন একটা পরিবার, যেখানে ইংরেজি ভাবধারা। সকলেই ইংরেজের উচ্চপদস্থ কর্মচারি। সেলফ-হেলফ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট মানে তুমি কারও ওপর নির্ভর করবে না। আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট পরমহংসদেব। আমি সরকারি চাকরিতে ঢোকার আগে আমার একটা পিরিয়ড আছে।

প্রশ্ন:‌ লেখার জগতে এলেন কীভাবে?‌ শুরু থেকেই কি হাসির লেখা লিখবেন বলে ঠিক করেছিলেন?‌

উত্তর:‌ আমি চেয়েছিলাম সন্ন্যাসী হতে। ১৯৫৬-এর ২০ জানুয়ারি আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। প্রথমে আমি একটা প্রবন্ধ লিখলাম। সেই প্রবন্ধের নাম ‘মানুষ’। আমি নিজে ভারতীয়। কিন্তু সেই প্রবন্ধে আমি যে দার্শনিকদের কথা বললাম, তাতে একজনও ভারতীয় নেই। সেখানে কান্ট, হেগেল, হিউম, ডেকার্স –‌এঁরা আছেন। সেই প্রবন্ধটি পাঠালাম ‘উদ্বোধন’ পত্রিকায়। তার সম্পাদক তখন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ। তিনি প্রবন্ধটা পড়ে আমাকে দেখা করতে বলেন। ওই ১৯৫৬-এর ২০ জানুয়ারি আমি যাই। তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে হা হা করে হাসতে লাগলেন। আমি প্রণাম করলাম। আমি বললাম, মহারাজ এতই খারাপ লিখেছি যে, আমাকে ডেকে সেই কথাটাই বললেন। তিনি বললেননা না, আমি একটা ধাক্কা খেলাম। প্রবন্ধটা পড়ে আমি ভেবেছিলাম যে, তুমি কোনও রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারি বৃদ্ধকে দেখব। চোখে ছানি কাটা চশমা। কিন্তু তোমার তো সবে জীবন শুরু। বলেই আমাকে ওপরে নিয়ে গেলেন। সেই আমার এন্ট্রি হল। The world of Thakur, Maa and Swamiji. ‌এবং সেইদিনই আমায় পড়তে দিলেন স্বামীজির ‘‌স্বামী–‌শিষ্য সংবাদ

‌আমার দুঃখ হয়েছিল, কেন কথামৃত নয়। পরে বুঝেছিলাম, এঁরা চেয়েছিলেন, তরুণ প্রজন্ম স্বামীজির আদর্শে imbibed ‌হয়ে ঠাকুরের কাছে পৌঁছক। স্বামীজি বারবার বলছেন, ঠাকুরকে বুঝতে গেলে আগে আমার কাছে এসো। আমি না-বলে দিলে তোমরা বুঝতে পারবে না শ্রীরামকৃষ্ণ কে ছিলেন। মহারাজ বলেন যে, তোমার পরিবারে তুমি আর বাবা ছাড়া আর কেউ নেই। তা কী ভাবছো?‌ বললাম, ভেবেছি সন্ন্যাসী হবে। শ্রদ্ধানন্দজির সঙ্গে বাবার খুব পরিচয় ছিল। তিনি কেমিস্ট্রির ছাত্র। বাবা এবং আমিও তাই। কিন্তু আমি অঙ্কে কাঁচা। বাবা দুঃখ করতেন, এমন একটা ছেলে পেলাম যে দুইয়ে দুইয়ে চার, তাও জানে না। মহারাজ বললেন, দেখো সঞ্জীব, তুমি যদি দুম করে সন্ন্যাসী হব বলে বেরিয়ে যাও, তাহলে তিনি দুঃখ পাবেন। এবং তিনি শুধু তোমার জন্যই দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি। তখন তিনি আমায় দেওঘর রামকৃষ্ণ মিশনে শিক্ষকতার কাজে নিযুক্ত করেন।

প্রশ্ন:‌ এরপরই কি হাসির লেখায় প্রবেশ?‌ শুরু থেকেই একটা নিজস্ব ভাষা। এটা কি সচেতনভাবেই আনলেন?‌ নাকি লিখতে লিখতেই এসে গেল?

উত্তর:‌ আমি সরকারি চাকরি করি। আমার কাজই ছিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট। আমার প্রথম বই জীবিকার সন্ধানে। আমার একটা ইচ্ছে ছিল এই যে, আমি বড় বড় আমলাদের সঙ্গে চাকরি করেছি, এদেশের ভন্ডামি, দেশের প্রতি অশ্রদ্ধা, এদের পুরো ব্যাপারটাই একটা তামাশা। কিন্তু এদের সঙ্গে তো আমি লড়াই করতে পারব না। আমার কলম আছে। আমি লিখব। সার্কাস্টিক লেখা। আপনি যদি অপারেশন করেন, তাহলে একটা ট্রে–‌তে আপনার যেমন যন্ত্রপাতি দরকার, তেমন আমিও লিখতে গিয়ে দেখলাম, আমার যন্ত্রপাতি কী কী আছে। তার মধ্যে ভাষা একটা বিরাট ফ্যাক্টর। কাজেই আমাকে এমন একটা ভাষা তৈরি করতে হবে, যেটা কলকাতারও ভাষা হবে, আবার বীরভূমের গ্রামেরও ভাষা হবে। কলকাতার রকেরও ভাষা হবে, আবার ওপরে বসা মাস্টারমশাইদেরও ভাষা হবে। তাহলে, প্রথম হচ্ছে ল্যাঙ্গুয়েজ। অনেক ভেবে দেখলাম, বাঙালি কেউ বিশুদ্ধ বাংলা বলে না। তার মধ্যে ইংরেজি মিশে থাকে। হিন্দি থাকে। স্ল্যাং ল্যাঙ্গুয়েজের একটু রূপান্তর থাকে। আমার ‘‌শ্বেত পাথরের টেবিল’‌ গ্রন্থের বেশ কিছু গল্পে এই ভাষা আছে। নবনীতা দেবসেন এর সমালোচনা লেখার সময় বলেছিলেন, ‘‌এটা রিস্ক ল্যাঙ্গুয়েজ। শ্লীলতা এবং অশ্লীলতার মাঝে যে সরু পথ, সেই পথ দিয়ে এগোচ্ছে। একটু পা স্লিপ করলেই কেলেঙ্কারি।’‌ তাহলে, এই একটা আমি ভাষা পেলাম।

        এরপর সাবজেক্ট কী হবে?‌ কেসি দাসের উল্টোদিকে ট্রাম কোম্পানির যে ছোট ছোট প্লট আছে, তার ডানদিকে, সেখানে প্রতি সপ্তাহে সাহিত্যসভা বসত। যেখানে বিমল কর তাঁর সাহিত্য ভাবনার নতুন রীতি নিয়ে কথা বলতেন। বিমলদা আমাকে একটা কথা বলেছিলেন, যে জীবন আমি দেখিনি, সেই জীবন নিয়ে লেখা উচিত নয়। আমাদের মধ্যে একজন লেখক ছিলেন তুলসী। সে শিক্ষক। ওখানে আমরা যখন বসে থাকতাম, সেখানে এক দেহাতি মহিলাকে দেখতাম। তার বিশাল চেহারা। হাতে একটা ট্রানজিস্টার ঝুলছে। সে কখনও এদিকে যাচ্ছে, কখনও ওদিকে যাচ্ছে। তাকে নিয়ে তুলসী একটা গল্প লিখেছে। বিমলদা গল্পটা পড়লেন সেদিনের সভায়। তুলসী উসখুস করছে কেমন হয়েছে জানার জন্য। বিমলদা বললেন, শোন, তুই ওই মহিলাকে এইটুকু সময় ঘণ্টাখানেক দেখিস। তার আগেও জানিস না, তারপরেও জানিস না। বলেই বললেন, যে জীবন দেখোনি, সেই জীবন নিয়ে গল্প লিখো না। এইটা আমার মাথায় ঢুকে গেল। সত্যিই তো, যেখানে আমি নেই, গল্পে সেই গল্প কী করে হবে?‌ এবং তিনি এও বললেন, তোমার মধ্যে যদি কল্পনার সেই ঐশ্বর্যশক্তি না-থাকে, তাহলে ডেফিনেটলি সেটা ফেল করবে। আমরা অনেককিছুই দেখি না, কিন্তু একটা আইডিয়া বা থিমের ওপর স্ট্রাকচারটা গড়ে ওঠে। তখন কিন্তু একটা ইমাজিনেশন লাগে। তখন এটা ধরেই নিই যে, আমি ঘটনাস্থলে না-থাকলেও এটাই ঘটবে। This is the physichological phylosophy.‌ আমাদের মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন একটা animosity‌ আছে, সেটার ওপর বেস করে লেখা হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব হলেই কি সেটা ডিভোর্সের দিকে যাবে?‌ এখানেই বিমলদা বললেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব একটা natural process. That is also sex. ‌কারণ, উনি মনস্তত্ত্ব পড়েছেন। তাহলে, আমি কোন জীবন দেখেছি। আমি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে আমলাদের জীবন দেখেছি। আমি আমাদের বাড়িতে আদর্শবাদী মানুষ দেখেছি। সদা সত্য কথা বলিবে, কিন্তু মিথ্যে কথা বলিতেছি। সত্যি কথা বলিবে, এটা যে কত বড় মিথ্যে কথা, এটা জেনে গেছি। এরপর দেখলাম, একটা মধুর এলাকা পড়ে আছে। সেটা স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব।

বিমলদা বারবার বলেছেন, স্যাটায়ার করবে নিজেকে, অন্যকে নয়। তাহলে, সেটা হয়ে যাবে অসভ্যতা। রমেনবাবু বলেছিলেন, perfect gentleman and perfect literature redute happiness. ‌বিমল করের কথায়, সেক্সের একটা লিমিট থাকবে। বাকিটা তোমাকে ইঙ্গিতে বোঝাতে হবে। আমাকে বলতে হবে না যে, সে চুমু খাচ্ছে। কিছুদিন পরে আমার উপদেষ্টা এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু সমরেশ বসু বলেন, সঞ্জীব, প্রফেশনাল লেখক হওয়ার মতো দুঃখ আর কিছুতে নেই। দ্বিতীয় কথা বলেছিলেন, লিখবে লেখার ভেতরে বসে। Not for outside. Live a life and write. ‌তার মানে কি আমি ফুটপাথে গিয়ে শোব আর লিখব?‌ এখানেই আমার সংবেদনশীলতা। আমি বুঝে নেব। উদাস দৃষ্টিতে একটি মেয়ে বসে আছে। সে কী ভাবছে। একটি নিঃসঙ্গ বালক একটি চাকাকে সারা দুপুর চালিয়ে তাকে কাঁধে নিয়ে ফিরছে। সে কী ভাবছে। এই thought world ‌যদি কারও ভেতর না-থাকে, তাহলে মুশকিল। সে কী ভাবছে, সে কী ভাষায় ভাবছে, এটাও জরুরি।

  ‌‌‌‌

প্রশ্ন:‌ লেখার মাধ্যম হিসেবে আপনি স্যাটায়ারকে বেছে নিলেন কেন?

উত্তর:‌ আগেই বলেছি, আমি সরকারি অফিসে চাকরি করতাম। বড়বাবুদের অনেক ভণ্ডামি চোখের সামনেই দেখেছি। সরকারি অফিসের নানা দুর্নীতিও দেখেছি। মনে মনে তীব্র রাগ হত। আমি দেখলাম আমার ঢাল নেই, তরোয়াল নেই। আমার পুঞ্জীভূত প্রতিবাদ বা বিদ্বেষ ব্যক্ত করতে পারছি না। আমার হাতে শুধু কলমটুকুই আছে। আমি শুধু লিখতেই পারি। কিন্তু সেটাও সরাসরি পারি না। কারণ সরকারি চাকরির নানা বাধ্যবাধকতা। তখনি আশ্রয় নিলাম স্যাটায়ারের। এই ভাষাটাই আমার আয়ত্তে। ভদ্র ভাবে সূক্ষ্ম স্যাট্যায়ারের মাধ্যমেই আমি প্রতিবাদটা তুলে ধরতে পারি।

প্রশ্নঃ শ্বেতপাথরের টেবিলএর গল্পগুলো অনেকটা পরিবার কেন্দ্রিক।

কিন্তু হালকা হাসি চোখের জলএকেবারেই অন্য ঘরানার। এই পরিবর্তনটা কি

সচেতন ভাবেই এসেছে?

উত্তর:‌ আসলে আমার লেখার কতগুলো ডিপার্টমেন্ট হয়ে গেছে। আমি দেখলাম গল্পের অনেক দুর্বলতা আছে। কতগুলো টিপিক্যাল চরিত্র তৈরি করতে হবে। আমি স্যাটায়ারিস্ট হিউমারিস্ট বা শিবরাম চক্রবর্তী নই। আমি শিবরামবাবুর সেকেন্ড এডিশনও নই। আমি সিরিয়াস লেখক। শ্বেতপাথরের টেবিল-এর কোথাও হাস্যরস নেই। হাসি একটা মোড়ক মাত্র। সেখানে একটা ভয়ংকর বার্তা আছে। সেটা হল নারীকে অবদমিত করার চেষ্টা। আবু সইয়দ আইয়ুব এর স্ত্রী গৌরী দেবী বলেছিলেন, তিনি যদি আর কোনও গল্প নাও লেখেন তাহলেও বাংলা সাহিত্যে তাঁর একটা নাম থাকবে।তাহলে কি এখানেই থেমে যাব? নাকি একইরকম লেখাই লিখে যাব? ঠিক করলাম আমি আমার সাকসেসকে কখনও কপি করব না। একটা বিরাট জগৎ পড়ে আছে। সেখানে যে কোনও বিষয় নিয়ে এন্ট্রি হতে পারে। আমি যদি ভার্সেটাইল হতে চাই, তাহলে আমি ফুরিয়ে যাব না। আমি দেখলাম পৃথিবীর সমস্ত লেখাই টাইম বাউন্ড। সেই সময়টাকে জানতে হবে। নইলে কিছুই বোঝা যাবে না। তাহলে লিখতে হবে এমন বিষয় নিয়ে যা আমি আজও পড়ব আবার অনেক বছর পরেও পড়ব।  বিমলদা বলতেন হাসির লেখা লিখতে গেলে আগে ভালো ভালো সিচুয়েশান দরকার। তারপর টাই আপ। একটা ছোটগল্প বা ঘটনা ঠিক আছে। কিন্তু বড় কিছু লেখা মুশকিল। একটা সুগার কিউবে এক কাপ চা মিষ্টি হবে। হাজার কাপ তো হবে না। এই সমস্যাটাই লেখকের আসল সমস্যা। আমি একটা সিচুয়েশন পাচ্ছি। কিন্তু তার আগে বা পরের কিছুই জানি না। এটা ভয়ংকর ব্যাপার। ধরুন একটি মেয়ে কথা বলতে-বলতে মাঝে মাঝেই উদাস হয়ে যাচ্ছে। সে আপনার সঙ্গে হাসছে, গল্প করছে ঠিকই। কিন্তু যে লেখক মনস্তত্ত্ব বোঝেন, তিনিই বুঝতে পারবেন যে তার জীবনটি মোটেই আনন্দের নয়।

 

প্রশ্ন: দাম্পত্যের খুনসুটি বারবার উঠে এসেছে আপনার লেখায়। স্বামী-স্ত্রীর এই দ্বন্দ্ব কি হাসির গল্পে অন্য মাত্রা আনে? না কি হাসির গল্পের সুরটা কোথাও কেটে যায়?

উত্তর:‌ দাম্পত্য একটা অদ্ভুত রসায়ন। প্রতিদিন তাকে নতুন ভাবে সৃষ্টি করা চাই।

খুনসুটি, ঝগড়া এগুলো থাকবেই। এগুলোই সম্পর্ককে আরও মধুর ও প্রাণবন্ত করে। সেই ঝগড়ার মাঝেই প্রেমের এক ফল্গুধারা বয়ে যায়। আমি পাশে এমন একজনকে চাইব, যে আমাকে বোঝে, আমি যাকে বুঝি। এটাই প্রেম। প্রেম মানে আমি একটা দেহ পেয়েছি, লাফালাফি করছি সেটা নয়। প্রেম মানে একটা টাচ, একটা ফিলিংস, একটা স্মেল, ঘাড়ের কাছে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস, অ্যান্ড দ্যাট ইজ

লিটারেচার।

        ইগো কেন্দ্রিক মানুষ চিরকালই একটা উপহাসের বিষয়। ‘আমিই সব’ এই ব্যাপারটা আমার সব লেখাতেই উঠে এসেছে। সর্বত্র আমি আমি আমিআপনি যতই বড়লোক হোন, যতই টাকাপয়সা আপনার থাকুক, আপনি যতই দেখেশুনে বিয়ে করুন, সুখের জীবন আপনি পাবেন কি না সন্দেহ। সুখের সংসার অর্থে হয় না, হয় understanding-এ। সেখানেও একটা কথা আছে art of life. আপনাকে বুঝতে হবে আপনি কোথায় তাকে খোঁচা দিচ্ছেন যে কথায় তার চোখে জল বেরোচ্ছে। Rude and rough হলে আপনি জীবনে কিচ্ছু পাবেন না। অনুভব করতে হবে তার দুঃখটা কোথায়। আপনি তার জীবনে দুঃখের একটা কারণ হয়ে উঠছেন এখানেও জীবন তৈরির একটা ব্যাপার এবং সেখান থেকে সাহিত্য বেরিয়েছে। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়েই সমস্ত ব্যঙ্গবিদ্রুপ করেছি। কিন্তু আমার স্ত্রীর মতো দেবী পৃথিবীতে দ্বিতীয় নেই। ওই একটা জীবন পাশে না-পেলে আমার লেখা হত না। একারণেই আমার হাসি স্যাটায়ার বাস্তব। সেখানে ঘনাদাও নেই, টেনিদাও নেই।

 

প্রশ্ন: আপনার গল্পে আগে যে মজার চরিত্রের মিছিল ছিল এখনকার লেখাতে সেই চরিত্রের অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এর কারণ কী?

 

উত্তর: কারণ সেই চরিত্রগুলো আর নেই এই পৃথিবীতে। আমার বড়মামা আত্মহত্যা করেছিলেন। কাজেই তাকে তো আমি দেখতে পাচ্ছি না। তিনি আমার পাশে নেই। আর যে চরিত্রগুলো দেখতে পাচ্ছি না তাদেরকে নিয়ে আমি লিখতে পারি না। তাহলে সেটা হয়ে যাবে কাল্পনিক।

প্রশ্ন: যে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে হাসির লেখক হিসেবেই আমরা চিনি, তিনি একটা সময়ে এসে হাসি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন বয়স কি এভাবেই আধ্যাত্মবাদকে ডেকে আনে? নাকি হাসির উপাদানের অভাব?

উত্তর: একটু একটু করে পটভূমিটা বদলে গেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে গেছে। মজার সেই চরিত্রগুলো হারিয়ে গেছে। জীবনেই এত উপাদান ছিল যে, কল্পনার দরকার পড়ত না। চারপাশের মানুষগুলোকে নিয়েই তো সাহিত্য। সেই মজার মানুষগুলোই তো নেই। সেই ছিঁচকে চোর, রসিক গৃহস্থ আর নেই। তাই হাসিও শুকিয়ে গেছে।

      আমাদের বাড়ির পশ্চিমদিকে গঙ্গা। পশ্চিমদিকে একটা বারান্দাও আছে। এক্সক্লুসিভ বারান্দা। যেখানে গিয়ে দাঁড়ালে চারদিকটা দেখবেন সবুজ। আমাদের একটা অলৌকিক বেল গাছ আছে। সেই বেলগাছটা হরগৌরী। দুটো বেলগাছ এক হয়েছে। একটা তপোবনের মতোআমি ওখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। কারণ হু হু করে বাতাস বয় শুনেছেন। কিন্তু হু হু করে জীবন বয় এরকম কি শুনেছেন? এইদিকে দক্ষিণেশ্বর। আপনি অবাক হবেন রাত বারোটার পর দক্ষিণেশ্বরের দিক থেকে একটা বাতাস বয়ে আসে। সেই বাতাসটা অত্যন্ত আধ্যাত্মিক। আপনার গায়ে লাগলেই আপনি বুঝতে পারবেন it is something else. সেই বাতাসটা ওই দিকে চলে যায়। ঠাকুর বলছেন দক্ষিণেশ্বর থেকে কালীঘাটের মধ্যে শক্তি বিচরণ করছে। গল্প হারিয়ে গেলেই আমি সেই বেলগাছটার কাছে গিয়ে বসে থাকি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কথাসাহিত্যিক নলিনী বেরার সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন অন্তরা চৌধুরী

  প্রত্যেকটা উপন্যাসই আত্মজৈবনিক :   নলিনী বেরা                    ( নলিনী বেরার সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন অন্তরা চৌধুরী) বাংলা কথাসাহিত্যে নলিনী...