কেউ বলেন তিনি শাস্ত্রবিরোধী লেখক। কেউ বলেন হাসির লেখক। কেউ খুঁজে পান ব্ল্যাক হিউমার বা ম্যাজিক রিয়েলিজম। সব মিলিয়ে রমানাথ রায় মানেই এক স্বতন্ত্র ঘরানা। লেখকের নাম যদি নাও থাকে, তবুও অনেক লেখার ভিড়ে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায় কোনটা তাঁর লেখা। পাঠক থেকে গবেষক, নানা মহলেই তাঁকে ঘিরে আলাদা এক কৌতুহল। গবেষণা করতে গিয়েও বিভিন্ন গল্পকে ঘিরে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। নানা সময়ের নানা লেখায় কীভাবে নিজেকে ভেঙেছেন, গড়েছেন, বদলে যাওয়া সময়ের ছাপ কীভাবে তাঁর লেখায় ধরা দিয়েছে, এগুলো আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে স্বয়ং লেখকের মুখোমুখি হয়েছিলাম। দীর্ঘ তিন ঘণ্টার আলোচনায় যেমন ধোঁয়াশা কেটে গিয়েছিল, তেমনই অনেকটাই সমৃদ্ধ হয়েছিলাম। তাঁর সেই ব্যাখ্যা, তাঁর গল্পের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে খুবই সহায়ক হয়েছিল। বিভিন্ন অধ্যায়ে সেই ব্যাখ্যা ছড়িয়ে আছে। এখানে তার কিছুটা নির্যাস। সাক্ষাৎকারে সময় সকাল ১০. ৩০। তারিখ ১৭.০৫.২০১৭।
প্রশ্ন: আর দশজন হাসির লেখকের সঙ্গে আপনার লেখার ঘরানা একেবারেই আলাদা। ইচ্ছে করেই কি নিজেকে আলাদা করতে চাইলেন?
প্রশ্ন: জাদু বাস্তবতা রয়েছে আপনার গল্পে। এই ফর্ম সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?
উত্তর: জাদু বাস্তবতা আমার গল্পে ছিল না। এগুলো আমি জেনেছি ১৯৯০-এর পর। আমাদের নাগরিক জীবন এত বেশি স্বপ্নে ভরা, আমরা এত বেশি স্বপ্ন দেখি, অথচ বাস্তবটা অন্যরকম। বাবা-মা ছেলে সকলের সঙ্গে অশান্তি। সেখান থেকে আমরা একটা স্বপ্নের জগতে বসবাস করি। দিনের আমি যেমন সত্যি তেমনি রাত্রি বেলায় আমি যে স্বপ্ন দেখি সেটাও ভয়ংকর সত্যি। প্রান্তিক মানুষ মানেই সত্যি আর আমি বলেই সেটা মিথ্যে হবে কোন যুক্তিতে!
প্রশ্ন: আপনার গল্পের মৌলিক থিম হল প্রেমের অসম্ভাব্যতা। আপনার গল্পে নরনারী সম্পর্ক
স্পষ্টতই অসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে। কেন?
উত্তর: আসলে প্রেম কী, সেটা আমি নিজেও ঠিক উপলব্ধি করিনি। আমার বয়স যখন ২২, তখন বিয়ে হয়, আমার স্ত্রীর বয়স তখন ১৮। ফলে, শুরু থেকেই দাম্পত্য। আলাদাভাবে প্রেমের রোমাঞ্চ সেভাবে স্পর্শ করেনি। তাই আমার লেখাতেও সেভাবে ব্যাপারটা আসেনি। রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, একটা সময়ের পর স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্ক অনেকটা ভাইবোনের মতো হয়ে যায়। অনেকের জীবনেই তেমনটা দেখেছি। আসলে, প্রেম বলে যেটা মনে হয়, সেটা সাময়িক রূপমুগ্ধতা। মানুষ ভাবে, সে বোধ হয় প্রেমে পড়ল। এর রেশ কিন্তু কেটে যায়। আবার ভালো কাউকে দেখলে আগের প্রেমিকাকে ভুলে যায়। রহস্যের কারণেই নারীকে ঘিরে আকর্ষণ। যত দিন যাচ্ছে, সেই রহস্য হারিয়ে যাচ্ছে। আগে লুকিয়ে দেখা করা, চিঠি লেখা— এগুলোর মধ্যেও কিছুটা রোমাঞ্চ ছিল। ফোন নামক যন্ত্রটি এসে সেটুকুও নিয়ে নিয়েছে। এখন মেলামেশা এতটাই সহজ হয়ে গেছে, সেই রহস্য-রোমাঞ্চ কিছুই আর থাকছে না।
প্রশ্ন: অনেক গল্পে খুব করুণ পরিস্থিতিতে একই লাইনের বারবার পুনরাবৃত্তি। এটা কি সেই বিশেষ লাইনটার ওপর ফোকাস করতে চেয়েছেন?
উত্তর: বারবার এক কথা বললে, অনেক সময় একঘেয়ে হয়ে পড়ে। একই কথা একটা আচ্ছন্নতা তৈরি করে। আবার কখনও বারবার এক কথাই বলতে হয়। তাহলে, সেই কথাটার জোর বাড়ে। চণ্ডীপাঠের সময় একই কথা বারবার বলা হয়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বারবার ‘ইয়া দেবী সর্বভূতেষু...’ বলে গেছেন। একটা কথা এতবার বলেছেন যে, মনে গেঁথে গেছে। এটা যদি উনি বারবার না বলতেন, মানুষের মনে সেভাবে স্পর্শ করত না। তাই, কিছু কিছু গল্পের ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, বারবার একটা বা দুটো বাক্য বলা দরকার। তার মানে, আমি সেটার ওপরই জোর দিতে চাইছি। তুমিও সেদিকেই জোর দাও। আমি সেদিকেই আলো ফেলতে চাইছি। তুমি সেদিকেই তাকাও।
প্রশ্ন: অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, গল্পের শেষপর্বে এসে অদ্ভুত কিছু চমক। শেষবেলায় আপনি পাঠকের দিকে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন। এর কারণ কী?
উত্তর: হ্যাঁ, বেশ কয়েকটা গল্প এভাবেই শেষ করেছি। বিশেষ করে অনুশীলনী বলে একটা গল্পের কথা এখনই মনে পড়ছে। এটা আর কিছুই নয়, গল্পের সঙ্গে পাঠককে আরও একটু যুক্ত করা। সে কি এতক্ষণ শুধুই পড়ে গেল। তার মনে কি কোনও প্রশ্নই তৈরি হল না? শেষবেলায় এসে একটা ঝাঁকুনি দেওয়া। আমাদের পাঠ্যবইয়ে যেমন চ্যাপ্টার শেষে অনুশীলনীতে কিছু প্রশ্ন দেওয়া থাকে, এটাও সেরকম। পাঠক গল্প পড়ার পর সেই প্রশ্নগুলোও পড়ুক। তার মতো করে উত্তর খুঁজুক। এ অনেকটা ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’–এর মতো ব্যাপার। গল্প পড়ার পরেও রেশটা থাকুক। সে সেটা নিয়েই ভাবুক। কয়েকটা গল্পে এরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। তবে এটা সব লেখায় রাখতে গেলে ব্যাপারটা একঘেয়ে হয়ে যাবে। তাই অল্প কিছু গল্পেই এমনটা আছে।
প্রশ্ন: বেশ কিছু গল্পে দেখা যাচ্ছে, শেষবেলায় এসে দু–তিন রকম সম্ভাবনা বেরিয়ে আসছে। এটাও হতে পারে, ওটাও হতে পারে। পাঠক কোন রাস্তায় যাবে, দেখতে চেয়েছেন? নাকি পাঠককে রাস্তা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন?
উত্তর: এটাও একটা স্টাইল। পাঠককে আরও টেনে আনার। একইসঙ্গে কিছুটা স্বাধীনতা দেওয়ারও গল্প। গল্প পড়লেই কেন ফুরিয়ে যাবে। গল্প তো শুধু আমার নয়, পাঠকেরও। কোনদিকে গল্পটা এগোবে, সেও তার মতো করে ভাবুক। তার যদি মনে হয়, এভাবে শেষ হলে ভালো হয়, তবে সেভাবেই ভাবতে পারে। আবার তার যদি মনে হয়, অন্যরকম কিছু হলে ভালো হত, তাহলে সেটাও ভাবতে পারে। আবার আমার ফর্মুলাতেই এগোতে হবে, এমন নয়। আমি সম্ভাব্য দুটো বা তিনটে রাস্তার কথা বললাম। তার বাইরেও পাঠকের আলাদা ভাবনা থাকতে পারে। এগুলো নিয়ে যত সে ভাববে, তত সে গল্পটাকে নিজের বলে মনে করবে। তখন আর গল্পটা শুধু লেখকের থাকে না, পাঠকেরও হয়ে ওঠে।
| কথাসাহিত্যিক রমানাথ রায়ের সঙ্গে অন্তরা চৌধুরী |
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন