আমার লেখালেখির শুরুই হয়েছিল একটা অব্যক্ত প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে: সাধন চট্টোপাধ্যায়
মুখোমুখি: ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়
লেখার প্রতি দায়বদ্ধতা এইজন লেখকের
থেকেই যায়। দায়বদ্ধতাই লেখককে তাঁর ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। বাংলা সাহিত্যজগৎ
তথা গদ্যসাহিত্য এইরকম বেশ কয়েকজন লেখককে পেয়েছে। পেছন ফিরে তাকিয়ে আমরা বেশ
কয়েকজন গদ্যকারকে মনে করতে পারি— ভগীরথ মিশ্র, ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়, কার্তিক
লাহিড়ী, সাধন চট্টোপাধ্যায় ও স্বপ্নময় চক্রবর্তীকে।
খুব ছোট বয়স
থেকে তাঁকে চিনলেও, লেখক হিসেবে তাঁকে চিনতে পেরেছি পরিণত বয়সে। ক্ষমতার খুব
কাছাকাছি থাকা মানুষগুলোর চারপাশে থেকে তিনি দেখেছেন ক্ষমতার বিশ্বায়ন, যা তাঁর
লেখাকে সমৃদ্ধ করেছে বারবার। রাজনৈতিক ক্ষমতা কীভাবে কোন ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ বা
প্রতিষ্ঠানকে আশ্রয় করে তা তিনি উপলব্ধি করেছেন। ওপার বাংলার বরিশালে আত্মপ্রকাশ
করলেও চলে এসেছিলেন এপারে। স্বাধীনতার ক্রান্তিলগ্নে তাঁর জন্ম। কিছুকাল পূর্বেই
মন্বন্তর ঘটে গেছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা (১৯৪৬), দেশভাগ (১৯৪৭) বাংলার
প্রাণশক্তিতে আঘাত হেনেছে। তিনি দেখেছেন খাদ্য আন্দোলন — বহু দরিদ্র মানুষের মুক্তির স্বপ্ন, ক্ষুধামুক্ত সুস্থ জীবনের
স্বপ্ন, বাঁচার স্বপ্ন — দেশনেতাদের দেওয়া স্বপ্নের পসরা— তিনি এসবই প্রত্যক্ষ করেছেন। সৃষ্টির স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি মিশে যান
প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে। সত্তর দশকের অনেকেই ছিলেন এই একই সারিতে। বয়ে চলা সেই
পঙ্গু সময় তাঁর লেখাকে এগিয়ে নিয়ে চলল সামনের দিকে। লেখকের জীবনসত্যের সন্ধানে
তিনি ডুব দিলেন জীবনের অন্তঃপুরে।
লেখকের
প্রথম পর্বের উপন্যাস ‘পক্ষবিপক্ষ’ আশির দশকের বদলে যাওয়া গ্রামবাংলার দলিল। বাম
আমলে দলগুলি ক্ষমতালাভের পর, কৃষকের বদলে তারা জোতদার ও মহাজনের স্বার্থ দেখেছে।
এই উপন্যাস বামজমানায় শাসিত গ্রামবাংলার এক বিশ্বস্ত দলিল।
এরপর ‘গহিন
গাঙ’-এ সাধন চট্টোপাধ্যায় সুন্দরবনের প্রান্তিক জীবনের রূপরেখা তুলে ধরেছেন।
যেখানে বাঘ, কুমীর, মধু-সংগ্রহ, মাছধরা ইত্যাদি বিষয়বস্তু স্বচ্ছন্দ উপস্থিতি।
এরসঙ্গে ওষ্ঠাগত মহাজনি ঋণের দুর্বোধ্য জাল, বেতনা নদীর তীরবর্তি মালোপাড়ার
জীবনচিত্র ধরা পড়েছে তাঁর লেখনীর জালে। ‘তেঁতুলপাতার ঝোল’-এ সাধনবাবু দেখিয়েছেন
শিক্ষকসমাজের একটি সময়ের দলিলকে। একসময় শিক্ষকদের প্রায় বেতন বলে কিছু ছিল না
কিন্তু জনসাধারণের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ছিল। পরবর্তী সময় অ্যাকাডেমিক রেজাল্টে যোগ্য
শিক্ষকের মধ্যে দেখা যায় নিষ্ঠা, আন্তরিকতা অ দায়বদ্ধতার অভাব।
‘মাটির
অ্যান্টেনা’ উপন্যাসে তিনি এনেছেন গ্রামীন নারীর অবস্থানকে। যদিও সেসময়
নারীশিক্ষার প্রসার ঘটেছে, কিন্তু সমাজের deep structure কী বলে? প্রকৃত অবস্থা অন্য। নিয়ন্তার ভূমিকায় থেকে যাচ্ছে সেই
পুরুষ-শাসন। নারীর ক্ষমতায়ন আসলে তাদের দয়ার দান।
‘শেষরাতের
শেয়াল’, ‘গুল্মলতার ইলেকট্রন’ উপন্যাসের প্রসঙ্গগুলি উল্লেখ্য। ‘শেষরাতের শেয়াল’-এ
কথকের ভূমিকায় আসীন হয়েছেন তরুবালা। অধুনা বিলুপ্ত ‘সোনাই’ নদী পুনরুদ্ধারের
অভিযান নিয়ে এ উপন্যাস। ‘গুল্মলতার ইলেকট্রন’-এ রয়েছে পুরোনো ঐতিহ্য রক্ষার সঙ্গে
লোভ, লালসা, দ্বন্দ্ব। সাধনবাবু সময়ের রন্ধ্রে প্রবেশ করে, তাকে নিয়ে খেলেছেন যেন। এছাড়া ‘সাতপুরুষ
ডট কম’, ‘দিন আসে, দিন যায়’ উপন্যাসগুলোর আঙ্গিক ভিন্নধর্মী। ‘পাল্টিপুরাণ’,
‘ধরিত্রী’, ‘জলতিমির’, ‘বিন্দু থেকে বৃত্তে’ উপন্যাসগুলোতেও কালচেতনার ঐশ্বর্য
রেখে যান। ‘জলতিমির’, ‘বিন্দু থেকে বৃত্তে’ পরিবেশ সচেতনতার শিল্পভাষ্য।
‘জলতিমির’-এ রয়েছে আর্সেনিক দূষণের ওপর গড়ে ওঠা পাঁচপোতা এবং আশেপাশের গ্রামের
মানুষের জীবনচিত্র। ‘বিন্দু থেকে বৃত্তে’ উপন্যাসে পরিবেশ সচেতন মানুষের একক সংগ্রামের কাহিনি।
সাধন
চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে ধরে রেখেছেন সময়ের ফসল। রাজনীতিকেন্দ্রিক মানুষগুলির বোধিবিন্দু, পরিবেশ, নারীর লড়াই,
গ্রাম্য কূটকাঁচালি, ইত্যাদি। এছাড়া ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সভ্যতার
প্রবহমান ইতিহাস। ফুকো-র মতে, ‘একালের ক্ষমতাতন্ত্র আদি সার্বভৌমত্বের ছক অনুসরণ
করে চলে না, তা চলে অনুশাসন ও ডিসিপ্লিনের ছকে।’ সাধনবাবুর উপন্যাসে, ছোটগল্পে
তাঁর এই ধারাটি বারবার লক্ষ করা যায়। ক্ষমতা থাকলে শোষণ আসবে, এবং জন্ম নেবে প্রতিবাদ।
এই প্রতিবাদও তাঁর উপন্যাসের চরিত্রে লক্ষ করা যায়, যেমন শ্রীপদ। আবার
পরিবেশবাদ-এর Ecological Balance রক্ষার কথা বলেন, তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে,
ছোটগল্পে। কখনও তাঁর উপন্যাসে সুন্দরবন অঞ্চলের স্থানিক পটভূমির ওপর গড়ে তুলেছেন
তাঁর আঞ্চলিক উপন্যাসকে। আবার সময়ের সমস্যাকেও খোঁচা মেরে দেখিয়েছেন শিক্ষকদের
ভূমিকায়। সর্বোপরি নিছক উপন্যাস/ ছোটগল্প প্রতিবেদন রচনা নয়— সাধন চট্টোপাধযায়ের উপন্যাসগুলি বাংলা সাহিত্যে দিনবদলের
অভিজ্ঞান রেখে যায়। — ঝুমা
গঙ্গোপাধ্যায়
| ছবি: ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায় |
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: সাধনদা,
বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও বাংলা সাহিত্য-অঙ্গনে
স্বচ্ছন্দ পদচারণা, বিজ্ঞান কীভাবে আপনার লেখায় প্রভাব ফেলেছে?
সাধন চট্টোপাধযায়: দেখো ঝুমা,
সাহিত্যিক হয়ে উঠতে প্রথাসিদ্ধ শিক্ষায় যে কলা কিংবা মানবী কোনও বিদ্যাশাখার
ট্রেনিং থাকতেই হবে, এমন চলতি ধারণা সমাজে আছে। কিন্তু, কেন? ভাবতে অবাক লাগে। বাস্তবে, আমাদের আধুনিক সাহিত্যের কবি-লেখকদের দিকে একটু
চোখ ফেরালেই দেখব, ডাক্তারিশাস্ত্র, বাস্তুকরি শিক্ষা বা বিজ্ঞানের মৌল বিষয়ে ও
মনোবিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্র থেকে বিশিষ্টজনরা এসেছেন এবং গল্প, উপন্যাস, কবিতায় যথেষ্ট
কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। বনফুল, রাজশেখর বসু (পরশুরাম), প্রেমেন্দ্র মিত্র, মানিক
বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে কাব্যে যতীন্দ্র সেনগুপ্ত, বিনয় মজুমদার থেকে সাম্প্রতিকালের
অনেক গল্পকার-কবিই তথাকথিত সাহিত্য ঘরাণার বাইরের পড়াশুনো শেষ করে এসেছেন।
বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম গদ্যকার হুমায়ুন আহমেদ তো রসায়নবিদ্যার অধ্যাপক। তাই মনে
হয় না, পদার্থবিদ্যা পড়ে সাহিত্য করতে আসা আমার কোনও ব্যাতিক্রমী প্রয়াস। তবে তোমার
প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ বিশেষে বলতে পারি, পদার্থবিদ্যা আমাকে অবচেতনে,
নিয়মানুবর্তিতার সহজাত একটি শিক্ষা দিয়েছে। সময়কে মান্যতা দেওয়া, পরিমিতিবোধ
এবং উচ্ছ্বাস-আবেগের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশ আমার বিজ্ঞানুশীলন থেকেই স্বভাবজাত। এর
প্রভাব আমার লেখালিখিতে স্পষ্ট। আখ্যানে অতিরিক্ত কথন আমার পছন্দ নয়, ইঙ্গিতময়তা
আমার প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। আমার দৃষ্টিতে হৃদয় ও বুদ্ধির একটি পরিমিত মিশ্রণ
তাই লক্ষণীয়। তথাকথিত জনপ্রিয়তার মশলা আমি পরিহার করে চলি।
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: ৬০/৭০
দশকে লেখকদের গল্পে, উপন্যাসে শ্রমিক মজুরদের একটা বড় প্রভাব লক্ষ করা যায়।
পরবর্তীকালে এই ধারা ক্রমে থিতু হয়ে আসে, এ বিষয়ে আপনার কী মনে হয়?
সাধন চট্টোপাধযায়: ৬০-৭০
পর্যন্ত বাঙালি মধ্যবিও শ্রেণির চেতনায় ছিল সমাজ পরিবর্তনের আশঙ্কা এবং নিজেদের
শ্রেণিগত অবস্থানে দেশের শ্রমজীবী মানুষ ও কৃষকের সাথে আত্মীয়তাবোধের একটা তাগাদা। তাই,
সাহিত্য-শিল্পে তারই প্রতিফলন মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রত্যাশা রেখে, যথাযথ বাহবা দিত।
সত্তরের পর, সমাজ বদলানোর রাজনীতির ব্যর্থতা, রাষ্ট্রশক্তির দানবীয় রূপ, ক্ষমতার
প্রকৃত চরিত্র, পৃথিবীতে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পরিণতি, ভোগবাদ, কর্পোরেট শক্তির
উদ্ভব এবং বিনোদনশিল্পের সর্বগ্রাসী রূপ বাঙালি মধ্যবিওকে অদ্ভুত মায়াবশবর্তী করে
‘হোসেন মিঞার ময়নাদ্বীপে' নিয়ে ফেলেছে। এখন বাঙালি মধ্যবিত্ত
শ্রেণিগতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিত্তশালী শ্রেণির লেজুড়ে পরিণত। পোশাক, খাদ্য,
রুচি, বাসস্থান থেকে ভোগ্যদ্রব্য— পণ্য সংস্কৃতির অন্যতম
নির্ভরশীল স্তম্ভে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আর পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠবার পিপাসায়
লেখকরা ওই মধ্যবিত্ত শ্রেণি যা সাহিত্য চায়— তাই ভাষায়
মুড়ে সরবরাহে সচেষ্ট। লেখক হিসেবে ভেসে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা। তাই বর্তমানে
গল্প-উপন্যাসে কৃষক, শ্রমিক দূরবীণে দেখতে হয়। তাছাড়া,
নতুন প্রজন্মের লেখক-পাঠকদের মধ্যে এমন ধারণা জন্মে গেছে, শ্রমিক-কৃষকদের নিয়ে
লেখার অর্থই হল, বিশেষ কোনও ইজম-এর সমর্থক পড়া। বিপরীতে, রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে
যে-সব নেতা-অনুগামীরা শ্রমিক-কৃষকের দল হিসেবে আত্মপরিচয় দেন, সাহিত্য নিয়ে তাদের
স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পাই না। ওই সেলিব্রিটিতন্ত্রেই তাদেরও যেন সায়। এই ‘খগেন’
মার্কা পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্য কোনও সমাজে আছে কি না জানি না। এ-পরিস্থিতিতে,
কে আর ভূতের বেগার খাটার মতো পরিশ্রম করে শ্রমিক-কৃষকদের জীবন আঁকতে যাবে? এ-কাজটি
যে শ্রমসাধ্য ও কঠিনকর্ম।
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: সমসাময়িক
সাহিত্যধারাতে লক্ষ করা যায়, উপন্যাসের থেকে ছোটগল্পের দিকে ঝোঁক বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেখক মানসিকতার কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায় এতে?
সাধন চট্টোপাধযায়: শুধু সমসাময়িক বলছ কেন, বরাবরই সংখ্যায়
উপন্যাসের চাইতে ছোটগল্প লেখা হয় বেশি। যদি তুমি পুজোসংখ্যাগুলো দেখো, বিপুল সংখ্যক
লিট্ল ম্যাগাজিনে— যা বাজারে বেরুচ্ছে— কোথাও এক-আধখানা উপন্যাস বেরুলেও, শত শত গল্প
প্রকাশ পাচ্ছে। উপন্যাসের চাইতে গল্প ছাপানোর সুযোগ লেখকদের অনেক বেশি। এমনকি,
বাণিজ্যিক পত্রিকাতেও সংখ্যায় উপন্যাসের চাইতে গল্প বেশি।
দ্বিতীয়ত, নিছক যদি কায়িক পরিশ্রমের কথা বিবেচনায় রাখি, একটি উপন্যাস লিখতে
অনেক বেশি শ্রমের প্রয়োজন। অন্তত সময় হিসেবে দু-আড়াই মাস লাগবে। ওই-সময় এবং শ্রমে,
অনেক বেশি গল্প লেখার সুযোগ। আর সুযোগ
অর্থে নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার বাস্তবতা। আজকাল মনোযোগী পাঠক খুব কম। ছাপায় কারও নাম
বেশি বেশি দেখলেই বড় লেখক হয়ে গেছে ভেবে নেয় হয়তো!
ফলে, গল্প ছাপানোর সুযোগ যেমন বেশি, লেখকদের মানসিকতাতেও গুরুত্ব পাওয়ার ব্যাপার
আছে। আর, বর্তমানের ই-ম্যাগাজিনগুলোর আবির্ভাবে, পাঠক স্ক্রিনে উপন্যাস এড়িয়ে যায়,
সুতরাং ছোটগল্প এবং অণুগল্পেরই আধিক্য। তবে, বাংলার প্রকাশক সমাজ উপন্যাস ছাপতেই বেশি
আগ্রহী। তার কোনও পরিবর্তন হয়নি বলে মনে হয়।
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: বাংলা
গদ্যের যে ক্রমবিবর্তন, তা নিয়ে আপনার মতামত কী?
সাধন চট্টোপাধযায়: তোমার এই প্রশ্নের
উত্তর স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধ দাবি করে। খুবই জরুরি বিষয় এটি। বাংলা গদ্যকে ভাবে-সৌন্দর্যে
গতিমুখর করেছিলেন বিদ্যাসাগর। এই ভাব ও গতিকে আশ্রয় করেই বঙ্কিম দুর্গেশনন্দিনীর মধ্যেই
প্রথম উপন্যাসের ভিত ও কাঠামো নির্মাণ করেছিলেন। প্রসঙ্গত বলি তোমায়, যারা ‘আলাল’-কে
প্রথম উপন্যাসের শিরোপা লাগাতে চান, আমি সহমত নই। বঙ্কিমের ভাষা ও কাঠামোর প্রথম মেরামতি
শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের হাতে। বিংশ শতাব্দীর গোড়াতেই লেখা ‘চোখের বালি’-তে। তবুও রবীন্দ্রনাথ
সংলাপের ভাষাকে সাধু-ই রেখেছিলেন। যেমন, ‘মহেন্দ্র।
তবে, এখন তুমি কী করিতে চাও?’
আশা। ‘আগে বিহারী ঠাকুরপো আসিয়া একবার দেখিয়া যান তিনি যেরূপ পরামর্শ দিবেন,
তাহাই করব।’
‘চোখের বালি’র প্রকাশের সাত বছর পর, ‘গোরা’-তে রবীন্দ্রনাথ সাধু-চলিতের মিশ্রণ
ঘটালেন। আখ্যানের ভাষা সাধু, সংলাপ চলিত।
‘ইহার পর হারাণের পক্ষে হার মানা আরো শক্ত হইয়া উঠিল।’ তিনি আরো সুর চড়াইয়া
বাঙালির নিন্দায় প্রবৃত্ত হইলেন। বাঙালি সমাজের নানা প্রকার প্রথার উল্লেখে কহিলেন,
‘এ-সমস্ত থাকতে বাঙালির কোনো আশা নেই।’
এর পর
রবীন্দ্রনাথের উপদেশে প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ সর্বত্র চলিত ভাষার প্রয়োগ চালালেন। ‘যোগাযোগ’-এ রবীন্দ্ৰনাথ সম্পূর্ণ চলিত ভাষার প্রয়োগ করলেন। বাংলা
গদ্যের ক্রমবিবর্তনে ‘যোগাযোগ’ ল্যান্ডমার্ক।
এরপর, আধুনিক গদ্যকাররা, মানিক-বিভূতি-তারাশঙ্কর-প্রেমেন্দ্র-সতীনাথরা
কখনো পুরোটা চলিত, কখনো সাধু-চলিতের মিশ্রণে বাংলা গদ্যের বিবর্তনের
হাওয়াটিকে সমৃদ্ধতর করে তুললেন।
এ-ভাবেই
স্বাধীনতার পর, উপন্যাসে ভাষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কমলকুমার, অমিয়ভূষণ, লোকনাথ ভট্টাচার্য,
দীপেন্দ্রনাথ, দেবেশ রায় বা সন্দীপ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকরা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা
চালালেন। গদ্যে আঞ্চলিক শব্দ, বাগ্ধারার প্রয়োগ হল। সতীনাথের
‘ঢোঁড়াই চরিতমানস’, সমরেশের ‘বিটি রোডের ধারে’ গল্পে এবং পরবর্তীতে ‘বাথান’ ও ‘খিচকবালা
সমাচারে’ গদ্যের বৈচিত্র্য আরও কিছু মাত্রা পেয়ে গেল।
আবার এটাও লক্ষণীয়, পাশাপাশি গদ্যের আদলে ঢুকে পড়ল সংবাদ পরিবেশনধর্মী আদল। মূলত,
বর্তমান বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে গদ্য কমবেশি কাহিনির টান বজায় রাখতে সাংবাদিকধর্মিতার
প্রবল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
তবে, ইদানীং ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রভাবে, আঞ্চলিক নানা বাগ্ধারা আখ্যানে প্রয়োগ জরুরি হয়ে উঠছে। বাংলা গদ্যের ভুবন বিস্তৃতি লাভ করছে।
তবে, মানুষের উচ্চারিত ভাষার বাইরে চেতন বা অবচেতনের অনুক্ত ভাষার ফর্মটি নিয়ে তেমন
প্রচেষ্টা বা কোনো প্রচেষ্টার সাথেই লেখকরা হাঁটছেন না। জানি না, জনপ্রিয়তা ও বই কাটতির
চিরাচরিত বাঁধা রাস্তা ছেড়ে লেখকরা আজ তেমন ঝুঁকি নেবেন কি না। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার
জন্য শুধু লেখক নয়, পাঠকদের তরফ থেকে উৎসাহ জাগা দরকার। তাদেরও প্রস্তুতি দরকার।
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: উপন্যাস
বা যে-কোনও সাহিত্য সৃষ্টি কি শুধুই সন্তান
উৎপাদনের মতো লেখকের জৈবিক আত্মরতির ফসল, না কি আজকের পৃথিবীতে
সাহিত্য সৃষ্টির আলাদা কোনও অস্তিত্ব আছে?
সাধন চট্টোপাধযায়: সন্তান উৎপাদন বা আত্মরতি প্রাকৃতিক বিষয়। পৃথিবীর যেকোনও মানুষ— ইংলন্ডের রাজা-রানি, শক্তিধর দেশের রাষ্ট্রপ্রধান-সহ যে-কোনও সমাজের ‘রামা
কৈবর্ত’ বা ‘হালিম শেখ’-রা প্রকৃতির ধর্মটি যার যার মতো পালন করেন।
লেখা কিন্তু প্রাকৃতিক ব্যাপার নয়। বিশেষ একটি অভ্যেস, যা কল্পনার সঙ্গে তার সেতুবন্ধনে
আনন্দ লাভ করে। সব লেখা ভালো না হতেই পারে। আম গাছে অজস্র মুকুল, পর্যাপ্ত গুটি—কিন্তু ঝরে-খসে, তা থেকে ক’টি ফল দেবতার পায়ে নিবেদিত
হতে পারে? আপন মনের কল্পনার খেলায় সৃষ্টিও তেমন সাময়িকতার দাবি মেটায়, কত সংখ্যক
কালজয়ী হতে পারে? কিন্তু প্রক্রিয়া চক্রবৎ চলতেই থাকে।
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: বাংলা
ভাষার একজন প্রধান কথাসাহিত্যিক হিসেবে এই ভাষার অস্তিত্ব নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
সাধন চট্টোপাধযায়: শুনে রাখো ঝুমা, যে-ভাষায় লিখে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার আসে, যে-ভাষার প্রতিষ্ঠায়
দেশবাসী শহিদ হন এবং আস্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে পারে, পৃথিবীর কোনও ভাষায়
যার নজির নেই, তার অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান হওয়া কাজের কথা নয়।
(এইটুকু
সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় ১.১১.২০২০)
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: আপনার ছোটগল্পের বিস্তৃতি অনেক বেশি। তিনটি খণ্ডে প্রকাশিত ছোটগল্পগুলির আঙ্গিক গঠনশৈলী, বিস্তৃতি জনগোষ্ঠী নিয়ে যদি কিছু বলেন—
সাধন চট্টোপাধযায়: দ্যাখো ঝুমা, বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছি, পুরো জীবনটাই ওর পেছনে থাকব— এই ধারণার স্বপ্নভঙ্গে অবশ্যই সাহিত্যচর্চায় আসা, তাই ভাষা, প্রকাশভঙ্গী ও না-ফেনানোর ট্রেনিং স্বভাবে রপ্ত থাকায়, মিতপরিমাপের প্রতি ঝোঁক রয়ে গেছে। মনে হয়, মানুষের কাছে কিছু প্রকাশের জন্য এত শব্দের ভণিতা কেন থাকবে? প্রকৃতিতে দেখবে, সর্বত্রই প্রয়োজনীয় মাপের অতিরিক্ততা নেই কোথাও। হাতির শুঁড়ের দৈর্ঘ্য খাদ্য সংগ্রহ ও পথচলার সুবিধার জন্য যতটা লম্বা দরকার— ততটুকুই। সৃষ্টিকর্তা যদি ‘খেলিয়ে-ফেনিয়ে’ মেজাজের হতেন, বেচারা হাতির কি লাঞ্ছনা হত ভেবেছ? ঠাট্টা থাক। চেষ্টা করব বৈঠকিয়ানার ছাপ রাখতে।
হ্যাঁ, আমার প্রকাশিত ছোটগল্পের সংখ্যা একটু বেশিই। সাড়ে ছ’শো থেকে সাতশোর মধ্যে হবেই। পূর্বপ্রস্তুতি না-থাকায়, শিক্ষানবিশির লেখাগুলো ঢুকে আছে এর মধ্যে। তাছাড়া শিল্পে কোনও চূড়ান্ততায় বিশ্বাসী নেই। যেখানে পৌঁছলেই সিদ্ধ বলা চলে। এখানে ওই ইংরেজি প্রবাদটি যথাযথ। Sky is the limit! তাই এই বয়সে পৌঁছেও ছোটগল্পে ক্রমাগত নিজের অতীতটাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটি প্রতিযোগিতার নেশা আছে আমার মধ্যে।
দ্যাখো, ছোটগল্পে আঙ্গিক, গঠনশৈলী, ভাষা, বিষয়বস্তু, কল্পপ্রতিমার ব্যবহার— কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ— এভাবে বলা মুশকিল। ছোটগল্প বলতে কি ঝকমকে ভাষাকে বুঝব কেবল? নাকি বয়সের চমৎকারিত্ব? অথবা শুধুই বিপ্লবী বিষয়বস্তু?
পাঠক হিসেবে আমাদের অভিজ্ঞতা, এক এক সময়ে কোনও কোনও লেখকের লেখা নিয়ে কী হইহই, মাতামাতি, ভালোলাগা। লক্ষ করবে, এই মাতামাতি হয় বক্তব্য, নয় প্রকাশভঙ্গির নতুনত্ব, নয়তো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অথবা বিচিত্র চরিত্র, ভাষার প্রয়োগ, চেতনার অন্তর্গত স্রোতকে ধরার চেষ্টা— নানা ভালোলাগার কেন্দ্রকে ঘিরে, পাঠক সত্যকে খুঁজে পেয়েছিল।
দশক পেরতে-পেরতে, নতুন নতুন পাঠক এসেছে, রুচি বদলেছে, স্টাইল স্থির থাকেনি, এবং নতুন নতুন দেশ-কালে দাঁড়িয়ে, যদি উপরোক্ত গল্পগুলোর পুনঃপাঠ ঘটাই— দেখব, পুরাতন সে বিষয় আর নেই। মনে হবে অতি সরল, কিংবা অগভীর বা স্রেফ মনভোলানো কাল পেরিয়ে এসে পাঠকের মনে যেন তেমন নাড়া দিচ্ছে না।
দু-চারটে উদাহরণ দিই। এক সময়ের পাঠকের রুচিতে নাড়া দেওয়া বিভিন্ন সময়-কালের কয়েকজন বিখ্যাত লেখক এবং তাঁদের গল্পের উল্লেখ করছি। প্রেমেনবাবুর ‘সংসার সীমান্তে’, সুবোধ ঘোষের ‘ফসিল’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টোপ’, সমরেশ বসুর ‘আদাব’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’, মহাশ্বেতা দেবীর ‘দ্রৌপদী’, বিমল করের ‘আমরা তিন প্রেমিক ও ভুবন’, ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখব কোথাও বক্তব্য, কোথাও আঙ্গিক, কোনও কোনও গল্পে বিচিত্র চরিত্র— পরিবেশনার জন্য যতটা তীব্রভাবে ভালোলাগাটুকু প্রকাশিত হয়েছিল, একটা কাল পেরিয়ে এসে, তা যেন কিছুটা স্তিমিত, অতিনাটকীয় কিংবা পল্লবগ্রহিতা আছে। অথচ সেইসব খ্যাত লেখকদেরই অন্যন্য কিছু গল্প, যা তখন প্রায় অনাদৃতই ছিল, এখন যেন মনে হয়, অনেক গভীর কথা বলছে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টোপ’ গল্পটির চেয়ে এখন ‘বনতুলসী’-কে আমার অনেক বেশি গভীর মনে হয়। তাহলে কি অতীত বিচারে ভ্রান্তি ছিল? বর্তমানের মূল্যায়ন সঠিক? সঠিক বা ভ্রান্তির কথা নয়। সব যুগেই প্রখ্যাত লেখকদের রচনায় সত্য লুকিয়ে থাকে। সত্যকে আশ্রয় করেই তো শিল্প নির্মাণ। কিন্তু কিছু সত্য সময়ের পরিবর্তনে ফুরিয়ে যায়। কিছু আছে চিরকালীন। বড় সত্যর সন্ধানই শিল্পীর কাম্য। তা স্টাইল, ভাষা, বিষয়বস্তুর মিলিত একটি প্যাকেজ। যার মধ্যে এমন কিছু শক্তি লুকিয়ে, যা কালাতিক্রম করেও পাঠকের বোধকে নাড়া দেয়। আমাদের আজও কি রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’, ‘পোষ্টমাস্টার’, বিভূতিভূষণের ‘পুঁইমাচা’, ‘আহ্বান’, মানিকের ‘প্রাগৈতিহাসিক', কমলকুমারের ‘তাহাদের কথা’, দীপেন্দ্রনাথের ‘জটায়ু’, মুস্তাফা সিরাজের ‘বুঢ়া পীরার দরগায়’ নাড়া দেয় না? শুধু নাড়া দেওয়া নয়, অনির্দেশ্য একটি বোধের জন্ম দেয়। বলতে চাই একটা টোটালিটি বা পূর্ণতার কথা।
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: আপনার উপন্যাস কিছু সময়ের সমস্যা,
ক্ষমতায়ন, অন্ত্যজ জীবনযাত্রার উপর নির্ভর করে
লেখা। নতুন ধরনের নির্মাণের কথা কিছু ভাবছেন?
সাধন চট্টোপাধযায়: ঝুমা, ‘নতুন ধরনের নির্মাণ’— অর্ধ বাক্যটি আমার কাছে সুস্পষ্ট নয়। এর দুটো
অর্থ হতে পারে। জানি না, কোন্টির ওপর জোর দিতে চাইছ।
প্রথম অর্থ হতে পারে, এত
দিন আমার উপন্যাসগুলোর যে-নির্মাণ পদ্ধতি, বদলে ফেলে তা নতুনতর কোনও আঙ্গিকে নির্মাণ করব কি না? কমলকুমার মজুমদার যেমন ‘অন্তর্জলিযাত্রার’ পর ‘সুহাসিনীর পমেটম' লিখেছিলেন কিংবা অমিয়ভূষণ ‘নয়নতারা’ লেখার পর, ‘মহিষকুড়ার
উপকথা’ বা ‘ফ্রাইডে আইল্যান্ড’… ইত্যাদি লিখেছিলেন।
ওই-সব পরিকল্পনার
মতো বৈচিত্র্যের সন্ধানে গবেষণার মতো ইচ্ছে আমার নেই।
দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে, এতবধি আমি যে যে সমস্যাগুলির ওপর আলো ফেলার চেষ্টা করেছি অন্য কোনও ক্ষেত্রে
আমার নতুন প্রয়াস থাকবে কি না। ইচ্ছে
যে আদৌ হয় না এমন নয়। যেমন, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর বাঙালি জীবন— যখন ঔপনিবেশিক শক্তি ক্রমে ক্রমে সমৃদ্ধশালী বাংলায় বাণিজ্যের
লোভে হাজির হচ্ছে— এই পটভূমিতে, ইতিহাসের
গোধূলিকালের বাঙালি জীবন নিয়ে লেখার বাসনা উঁকি দেয়। কখনও
মনে হয়, বাংলার ছোট ছোট নদীকে কেন্দ্র করে যে জনজীবন বয়ে চলেছে— উপন্যাসে ধরি। ছোট
ছোট নদী আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করে, যাদের ঘিরে গ্রামীণ জনজীবনের কোলাহল
আবর্তিত হচ্ছে।
তবে, এখন যে-বয়সে পৌঁছেছি, সাধ ও সাধ্যের মধ্যে মস্ত ফারাক। এ-সব লিখতে গেলে, যে-নিবিড় শ্রম ও
ছোটাছুটি দরকার, তা বোধহয় নেওয়ার সাধ্য নেই।
তবে, আমার দু-তিনটি যে সাম্প্রতিক উপন্যাস প্রকাশ পেয়েছে— যা সম্ভবত
তোমার হাতে যায়নি, আমার সমগ্রতেও অন্তর্ভুক্ত নয়— বিষয়ে ও লিখনের প্রসরণে কিছুটা ভিন্নমুখীন। আমি
পানিহাটির বাসিন্দা। পানিহাটিতে একদা
চৈতন্যদেবের পদধূলি পড়েছিল (১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে সম্ভবত) এবং এ-অঞ্চল হাজার বছর আগে ছিল তান্ত্রিক বৌদ্ধদের সাধনার
স্থান। নিত্যানন্দকে পাঠিয়ে চৈতন্যদেব এ-অঞ্চলের লেড়া-লেড়ি বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে বৈষ্ণব ধর্মে রূপান্তরিত
করেছিলেন। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে এ-শহরে রবীন্দ্রনাথ, প্রফুল্লচন্দ্র, রামকৃষ্ণদেব থেকে সুভাষচন্দ্র, সুকুমার রায়— অনেক মহান ব্যক্তিত্বেরই পদধূলি পড়েছিল। আবার
দেশভাগের পর, এ-শহরেই গড়ে উঠেছে উদ্বাস্তুদের
সর্বাধিক সংখ্যায় কলোনি। এক সময়
এ-শহরেই ছিল বস্ত্রশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আজ এ-শহর উন্নয়নের জোয়ারে কলকাতার সঙ্গে জুড়ে গেছে। পাঁচশ
বছরের এইসব পরিবর্তন— যাকে বলা যায় গঙ্গাতীরের ঘন জঙ্গলে আবৃত অখ্যাত
অঞ্চল থেকে গ্রাম— মফস্সল হয়ে ঝকঝকে শহরে পরিণত হবার বিবর্তিত
সময়কে— পাঁচশো বছরে স্প্যানে ধরার চেষ্টা করেছি আমার ‘পানিহাটি’
উপন্যাসে। লিখেছি একটি দিনকে কেন্দ্র করে, বৃদ্ধ এক স্বামী-স্ত্রীর জীবন-ইতিহাসকে জড়িয়ে,
বিচিত্র জীবনরহস্যের দিনলিপি। নাম
‘কোনো একদিন’। মহাভারতের বিরাটপর্বকে বিনির্মাণ করে, কর্ণের জীবন ও দুর্যোধন-যুধিষ্ঠিরের পাশাখেলার প্রেক্ষিত
বিশ্লেষণের মধ্যে একটি উপন্যাসিকা ‘অর্ধপাণ্ডব’ যে-নতুন নির্মাণের
প্রসঙ্গ তুমি উল্লেখ করতে চেয়েছিলে, আশা করি আখ্যান তিনটি পাঠ
করলে তোমার জিজ্ঞাসার কিছু কিছু প্রাসঙ্গিকতা মিটবে।
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: লিট্ল ম্যাগাজিন সম্পর্কে কিছু বলুন, মানে আপনার লেখার প্রথম দিককার সময়ের আর বর্তমান সময়ের যে প্রকাশ তার মধ্যে সাহিত্যগত দিক ও অবক্ষয়ের দিক কীভাবে ফুটে উঠেছে?
সাধন চট্টোপাধযায়: ১৯৬৯-৭০-এ আমার প্রথম
উপন্যাস ‘অগ্নিদগ্ধ’ একটি লিট্ল ম্যাগাজিনে (চতুষ্কোণ) ধারাবাহিক প্রকাশ পেয়েছে। এই আমার লেখকজীবনের যাত্রা শুরু, যদিও অপ্রস্তুত অবস্থায় সাহিত্যচর্চায় ঢুকে পড়ার জন্য শিক্ষানবিশিপর্বের লেখাগুলো ‘নন্দন’ নামক একটি লিট্ল ম্যাগাজিনে প্রকাশ পায়— যার সূত্রপাত হয়েছিল ‘বন্যা’ নামক গল্পটি লিখে (১৯৬৬)। তারপর ধারাবাহিকভাবে প্রায় পঞ্চাশ বছরের সময়সীমায় আমার লেখালেখির ৯৯.৯৯ ভাগ লিট্ল ম্যাগাজিন ধারণ করে রেখেছে।
আমাদের বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট লিট্ল ম্যাগাজিনগুলোর জন্ম থেকেই দেখেছি, বিশেষ একটি ভাবনাকে আশ্রয় করে প্রকাশ পেয়েছিল। বঙ্কিমবাবু পুরাতন, রুচিহীন লেখাগুলোকে ঝেঁটিয়ে পরিষ্কার করে, সমৃদ্ধ ভাবনার লেখালেখি, তরুণ প্রজন্মের কলমকে যথাযথ সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতেই ১৮৭২-এ ‘বঙ্গদর্শন’ প্রকাশ করেছিলেন। একেই আমরা লিট্ল ম্যাগাজিনের আদি হিসেবে মান্যতা দিই। এর পর বঙ্কিমবাবুরই ‘প্রচার’ ঠাকুর পরিবারের ‘ভারতী’, ‘বালকা’ বা কৃষ্ণদমনের ‘হিতবাদী’, বিংশ শতাব্দীতে এসে ‘প্রবাসী’, ‘সবুজপত্র’, ‘কল্লোল’, ‘কালিকলম’, ‘পরিচয়’, ‘পূর্বাশা’—আমাদের ঐতিহ্যময়, প্রাক্ স্বাধীনতা পর্বের যত বিশিষ্ট লিট্ল ম্যাগাজিন— প্রকাশের পটভূমিই ছিল কোনও বিশেষ ভাব-ভাবনার বাহক হিসেবে।
স্বাধীনতার পরেও, দুই-তিন দশক জুড়ে সাহিত্যের নানা আন্দোলন, বক্তব্য, আকরণ ও প্রকরণের বৈচিত্র্যকে, কিংবা রাজনৈতিক ভাবনাকে কেন্দ্র করে পত্রিকা প্রকাশ পেয়েছে, ভেঙেছে, বন্ধ হয়ে গেছে, কখনও বা নতুন উৎসাহে দেখা গিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কোনও পত্রিকার আবির্ভাব। অথবা কোনও সাহিত্য অ্যান্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন লিট্ল ম্যাগাজিনকে দেখেছি। যেমন হাংরি জেনারেশনের ‘ক্ষুধার্ত’, সিপিআই ভেঙে যখন সিপিএম হল সাংস্কৃতিক মুখপাত্র হিসেবে ‘পরিচয়’-এর সমান্তরালে ‘নন্দন’। আবার ৬৭-তে নকশাল আন্দোলনের বিশ্বাস নিয়ে বেরলো ‘অনীক’, ‘অনুষ্টুপ’, ‘মেনিফেস্টো’। এ-ভাবেই কোনও গোষ্ঠী বা গ্রুপ— তা রাজনৈতিক দীক্ষা বা নান্দনিক বোধ থেকে নতুন কিছু প্রকাশের প্রয়োজনবোধ যখনই করেছে, সৃষ্টি হয়েছে একটি পত্রিকার। যে-কোনও নতুন লিট্ল ম্যাগাজিন প্রকাশের পেছনে থাকত সমষ্টিগত প্রেরণা। প্রকাশক ও মালিকানা সমবায়িক কিংবা একক থাকুক— প্রেরণার কিছু ঐকমত্য না থাকলে পত্রিকা বেরোতো না। এ-যেন চিন্তাভাবনার একটি যুদ্ধক্ষেত্র। একদিকে বাণিজ্যিক বড়ো বড়ো পত্রিকা, বিপরীতে অসংখ্য লিট্ল ম্যাগাজিনের দৃঢ়চেতা লড়াই। সম্পর্কটা ভাদ্র-ভাসুরমশায়ের।
আবার কেউ কেউ লিট্ল ম্যাগাজিনে ভালো কবিতা বা গল্প লিখে সাড়া ফেলে দিয়ে হঠাৎ দেখতাম বাণিজ্য পত্রিকায় লিখে খুব খ্যাতি পেতে থাকতেন। তখন প্রচার করা হত, লিট্ল ম্যাগাজিন লেখক, কবিদের সূতিকাগার। পঞ্চাশ বা ষাট দশকের অনেক গদ্যকারই এভাবে প্রতিষ্ঠিত। সত্তর দশকের লেখকরা এই পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে, লিট্ল ম্যাগাজিনেই পরিপক্ব হতে থাকলেন।
ধীরে ধীরে, বাণিজ্যিক পত্রিকার প্রভাব ক্ষীণ হতে থাকা, লিট্ল ম্যাগাজিন জগতের ভিন্ন আইডেন্টিটি গড়ে ওঠা, বই ও লিট্ল ম্যাগাজিন মেলা, বামফ্রন্ট সরকারের সাংস্কৃতিক নীতি, সোভিয়েতের পতন, লিট্ল ম্যাগাজিনের মালিক-সম্পাদকের সামাজিক প্রতিপত্তি, বিজ্ঞাপন প্রাপ্তির গ্যারান্টির মধ্য দিয়ে, যখন কিছু কিছু পত্রিকা ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে থাকল— আকারে যেমন বিশাল বপু হল, চরিত্রেরও বদল ঘটতে লাগল। ক্রমে, বাণিজ্য ও অবাণিজ্য ধারার ফারাক ঘুচতে থাকল। বিশেষ সংখ্যা, ক্রোড়পত্র ও বিষয়ভিত্তিক পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে লিট্ল ম্যাগাজিনের স্বীকৃতি ও গুরুত্ব বাড়তে থাকল। সব দল একাকার। এতে লিট্ল ম্যাগাজিনের পুরাতন ভাব-সম্পদের বদল ঘটতে থাকে। এবং প্রযুক্তির রমরমা, চ্যানেলের আবির্ভাব ও ইন্টারনেটের যুগে, বাণিজ্য পত্রিকাগুলো একে একে বন্ধ হতে থাকা, সাহিত্যকে বিনোদনে পরিণত করার জন্য, ফ্যাশন, ধর্মচর্চা থেকে নানা বিষয়কে ফোকাসে আনতে, কবিতা-গল্প-উপন্যাস গৌণ হতে থাকল। বৃহৎ বাণিজ্য পত্রিকা আজ পুজোয় অমুক লেখকের কোন লেখাটি প্রকাশ করল, পাঠকের কৌতূহল নেই। শতবর্ষ, দ্বিশতবর্ষ, বা নানা রাজনৈতিক-সামাজিক-পরিবেশগত বিষয়ের জন্য প্রকাশ পেতে থাকল ব্যক্তি মালিকানার বহু ঢাউস সাইজের ম্যাগাজিন। বাণিজ্যিক লাভালাভের দিগন্ত খুলল। এবং বহু পত্রিকা ঘিরে সৃষ্টি হল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকাশনের। আজ অধিকাংশ লিট্ল ম্যাগাজিনই ব্যক্তি মালিকানার। বিষয়, দৃষ্টিভঙ্গি, নান্দনিক কোনও ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি নেই। কোন বিষয়টি ছাপলে পাঠক খাবে ভালো— এমন ভাবনার তরী বাইছেন তাঁরা। এবং গুণমানের প্রতিও যত্ন লক্ষ করা যাচ্ছে না। লেখা ছাপানোর ব্যাপারে নানা ‘factor’ এখন কাজ করছে।
এছাড়া লিট্ল ম্যাগাজিন বর্তমানে বিষয়ভিত্তিতেও নানা ঘটনার হয়ে গিয়েছে। লোকসংস্কৃতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, ভ্রমণ, মানসিক স্বাস্থ্য— বলতে গেলে জানবার বিষয় হিসেবেও এখন একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠেছে লিট্ল ম্যাগাজিন। ফলে, নতুন নতুন স্রোত যেমন আছে, সঙ্গে কচুরিপানা, প্ল্যাস্টিক, মরা সাপ-ব্যাঙ, গবাদি পশুও স্রোতে ভেসে আসছে।
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: লিট্ল ম্যাগাজিন না সোজাসুজি বই আকারে লেখা প্রকাশ, কোনটার প্রয়োজনীয়তা বেশি বলে আপনি মনে করেন?
সাধন চট্টোপাধযায়: এ-প্রশ্নের সহজসরল নির্দিষ্ট কোনো নিদান নেই। যদি তরুণ কোনও কবি হন কেউ, তাঁকে নিয়মিত লিট্ল ম্যাগাজিনে কবিতা লিখে অন্তত একটি ছোটখাটো বৃত্তে হলেও, পরিচিতি লাভ করতে হবে। তারপর কবিতার বই প্রকাশের ভাবনা। কম-বেশি একই সত্য গল্পকারদের গল্পে। একেবারে আনকোরা নতুন কবি-লেখকদের বই পাঠক কেনে না।
লেখক যদি লেখালেখির জগতে বেশ কিছুটা পরিচিতি লাভ করেও থাকেন কবিতা ও গল্পগুলো পূর্বমুদ্রিত হলে পাঠকের কাছে সমাদর একটু বেশিই মেলে। ফলে, বাণিজ্যিক সহায়তা হয় এবং প্রকাশককে তাঁর পরের গ্রন্থটি ছাপতে আগ্রহী থাকেন। তবে, পরিচিত লেখকরাও উপন্যাসের ব্যাপারে ভিন্ন হিসেবে চলেন। ইদানীং সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকার সংখ্যা আঙুলে গোনা। ধারাবাহিক প্রকাশের সম্ভাবনা তাই কম। আধা লিট্ল ম্যাগাজিন— আধা বাণিজ্যিক পরিচয় নিয়ে যারা আছেন, এক-আধখানা উপন্যাস কিস্তিতে কিস্তিতে ছাপেন বটে— এবং তা হলে বই আকারে প্রকাশের সম্ভাবনাও বেশি— কিন্তু সে-সবের সুযোগ সীমিত।
তবে, পরিচিত লেখকদের নতুন উপন্যাস প্রকাশ পেলে, ইতিমধ্যে লেখকের কিছু বিক্রিক্ষেত্র তৈরি হওয়ার ফলে, কিস্তির অপেক্ষায় না-থেকে, সরাসরি বই বেরনোই ভালো। কারণ, বর্তমানে বই-এর বাজার খুবই সংকুচিত হয়ে পড়ায়, যে-কোনও ভাবে, একজন মোটামুটি পরিচিত লেখকের যে-কোনও সুযোগ কাজে লাগানো দরকার। বলতে পারো, বইটা বেরোনোই তো শেষ কথা নয়। কিন্তু শেষ কথা যে কোনটি, কে বলে দিতে পারে?
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: আপনার প্রিয় কোনও লেখক সম্পর্কে বলুন, যাঁর লেখা আপনাকে প্রভাবিত করে।
সাধন চট্টোপাধযায়: আমার সমস্ত সত্তা জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। এটা কেমন জানো, আমরা যেমন দৈহিক ভাবে অক্সিজেন নিয়ে বাঁচি অথচ প্রতি মিনিট, ঘণ্টা, দিনে মনে রাখি না। আমার সত্তার গভীর অংশটুকুও বিশেষ এক ‘রবীন্দ্রনাথ’-কে নিয়ে অলক্ষ্যে সতেজ থাকে। তা চেতনে না অবচেতনে, জানি না। অবচেতনে হলেও মনের অজান্তে চেতনে ফুটে উঠে আমাকে অনির্দিষ্ট আনন্দ দেয়। অপ্রত্যক্ষ একটি ভবিষ্যতের রাস্তায় দোলন অনুভব করি। আর তুমি যা জানতে চেয়েছ, স্পষ্ট জানি এ-উত্তরটা সেখানে নেই। লেখালেখির শুরুই হয়েছিল একটা অব্যক্ত প্রত্যাখ্যানের মধ্যে দিয়ে। ‘সাহেব বিবি গোলাম’ পড়ে মনে হয়েছিল এ-রকম আমিও লিখতে পারি। সেই আমার শুরু। মজার কথা, কোনও সময়েই আমি বিমল মিত্রের ধার-কাছ দিয়ে যাইনি।
অন্ধ প্রেমে পড়েছিলাম মানিক
বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আমার গদ্য ও গল্পের বিষয় থেকে তখন মানিকের গন্ধ বেরত। তাতেই বুক ফুলিয়ে ঘুরেছি কতদিন। শেষে বোধোদয় হল, মানিকের মতোই যদি লিখি— কোনো স্বাতন্ত্র যদি না-থাকে— পৃথিবীতে দুটো মানুষের দরকার কী? হয় উনি, না হয় আমি থাকলেই হত। তখনই নিজস্ব ঘর বাঁধার চেষ্টা।
আজ অনেক লেখকই আমাকে কৌতূহলী করে, কিন্তু আমার প্রিয় নন তাঁরা। তবে ঘরাণা হিসেবে বলতে পারি, বিভূতি, সতীনাথ, অমিয়ভূষণ পড়তে-পড়তে নীরবে বলে উঠি সাবাস! বিশ্ব সাহিত্যের মধ্যে রুশ সাহিত্য— বিশেষত টলস্টয় এবং চেখভ আমার অতি প্রিয়। চেখভ পড়তে-পড়তে এখনও মনে হয়, এমন উচ্চতাকে কোনো কালেই ছুঁতে পারব না।
আর এ-যুগের যে-লেখকের প্রতি আকৃষ্ট, তিনি হলেন লাতিন আমেরিকার ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। হ্যাঁ, পর্তুগালের হো সে সারামাগো-ও আমাকে মুগ্ধ করে। বলতে পারো, আমার রক্তে ধ্রুপদী ধারার প্রতি একটু অতিরিক্ত আকর্ষণ।
ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়: উপন্যাস, ছোটগল্পের বাইরে অন্য ধারায় আপনি কী লিখছেন—
সাধন চট্টোপাধযায়: দেখো, কবিতা, ছড়া ও নাটক ছাড়া আমি সব বিষয়েই সারা বছর ধরে কিছু না কিছু লিখি। ফাইফরমাশ খাটার জন্য আমি কারও আবদার ফেলতে পারি না। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ-নিবন্ধ— বিশেষত বিজ্ঞান, পরিবেশ, সাহিত্য, দর্শন থেকে পুস্তক সমালোচনা, কারও গ্রন্থের ভূমিকা সমকালীন ঘটনাবলীর ওপর টিপ্পনি— চিন্তার খোরাক যেখানে পাই, লিখতে হয়, লিখতে কিছুটা ভালোবাসি। নইলে কেউ তো বন্দুক ধরে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় না! সত্যি বলতে, দিন তিন-চার অলস ও না-লেখা অবস্থায় থাকলে, আমার শারীরিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। তখন কলম কিংবা পেন্সিলে হিজিবিজি কিছু রেখাচিত্র এঁকে নিস্তার পাই।
যা হোক, এবার নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া ভালো, কেমন! এই হল তোমার প্রশ্নগুলো নিয়ে আমার কিছু এলোমেলো ভাবনার তথ্য ও বিবরণ।
(দ্বিতীয় অংশের তারিখের উল্লেখ নেই)
| ছবি: ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায় |